সরকারি চাকুরি’র বয়সসীমা বৃদ্ধি ও আগামী’র জাঙ্ক প্রশাসন

প্রকাশিতঃ মার্চ ২০, ২০১৬ আপডেটঃ ৫:১৭ অপরাহ্ন

কিছুদিন ধরেই সরকারি চাকুরি পাওয়ার ‘বয়সসীমা’ বাড়ানোর একটা আন্দোলন চোখে পড়ছে। এটাকে ৩৫ বছরে উন্নীত করতে চাচ্ছে তারা। মনে হচ্ছে আমাদের মেইনস্ট্রিম মিডিয়াগুলোও এটাকে প্রমোট করার চেষ্টা করছে। আমি সরকারী চাকুরীতে ঢোকার বয়সসীমা বৃদ্ধির বিপক্ষে আমার মতামত পেশ করছি এবং কারণগুলো বলছিঃ

১) ৩৫ বছরটা একজন বাঙালী নর-নারীর জন্য খুব একটা সুখকর নয়। কারণ এই সময়টা একজন মানুষের “লাইফ সাইকেল ট্রেন্ড” ব্রেকইভেন থেকে নিম্নগামী হতে শুরু করে। অর্থাৎ মানুষ মধ্যবয়সী হিসেবে ট্রিট হয় এবং মানুষের কর্মশক্তি ক্রমশ কমতে থাকে।

২) আমাদের ঐতিহাসিক জাতীয় চরিত্র থেকে আমরা জানি যে, এই ৩৫ বছর আসলে ৩৫ বছর না। এটা হবে ৩৬-৩৮ বছর কারণ আমাদের স্কুলের স্যার’রা বা বাবা-মায়েরা সন্তানের চাকুরী পাওয়ার হিসেবটা মাথায় রেখেই সার্টিফিকেটে বয়স কম দেখিয়ে থাকে। এখন যদি একজন ৩৫ বছরের মানুষকে চাকুরী দেওয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে আসলে চাকুরী পাচ্ছে আরও বেশী বয়সী বয়সের মানুষ।

৩) এই বয়সে অধিকাংশ মানুষই বিবাহিত হবে, থাকবে তাদের সন্তান-সন্ততি এবং এরা ইতিমিধ্যেই একটা পারিবারিক আবহের মধ্যে অনেকটা সময় পার করবে। এই মতাবস্থায় যদি সে সরকারী চাকুরী পায় তাহলে সে নানা কারণে তার পোস্টিং এরিয়াতে যাবে না। গেলেও দেখা যাবে তার ফ্যামিলি থাকছে এক জায়গায় আর সে থাকবে আর এক জায়গায়। তারপর একদিন দেখা যাবে সে তার কর্মস্থলে যাচ্ছে না বা ম্যানেজ করে ঢাকায় আসার তদ্বির শুরু করে দিয়েছে।

৪) একজন ২৫ বছর বয়সী যুবককে যত তাড়াতাড়ি ট্রেনিং দিয়ে তৈরী করা যাবে এবং যত দ্রুত সে শিখতে পাড়বে, একটা ৩৫ বছর বয়সী মানুষ তা পাড়বে না। জেনেটিক্যালী তা সম্ভব না।

৫) ধরুন, একজন ৩৫ বছর বয়সী ছেলে বা মেয়ে বিসিএস-এ এএসপি’তে কোয়ালিফাই করলো, এখন কি সে শারীরিকভাবে সক্ষম হবে এই পোস্টের জন্য? তাকে এই চাকুরী দেওয়টা যুক্তিসংগত হবে কিনা? দিলে রাষ্ট্র কি তার কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাবে?

৬) পৃথিবী ক্রমশ তরুণদের দিকে ঝুঁকছে। আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে কানাডার নব নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী সবাই কিন্তু তাদের সময়ে অনেক প্রৌড় ঝানু নেতাদের পিছনে ফেলে নির্বাচিত হয়েছিলেন। মাইক্রোসফট, গুগল থেকে শুরু করে আমাদের পাশের দেশের টাটা পর্যন্ত তাদের ব্যবসার প্রধান বানাচ্ছে অপেক্ষাকৃত তরুণদের সেখানে আমরা মধ্যবয়সীদের চাকুরীতে নিয়োগ দিতে চাচ্ছি। কেন? এদের কাছ থেকে বেশী ভাল সার্ভিস পাওয়া যাবে? তাহলে বলতে হয়, উপরের উদাহরণগুলো ভুল।

৭) এটা সত্য যে আমার মেয়ে আমার চেয়ে টেকনোলজি খুব দ্রুত ধরতে পারে। মাঝেমাঝে নিজেকে খুব বোকা মনে হয় ওর কাছে। একজন তরুণ অবশ্যই একজন মধ্যবয়সীর চেয়ে স্মার্ট হবে। সে দ্রুত টেকনোলজি ধরতে পাড়বে এবং শিখতে পাড়বে।

৮) একজন তরুণের লোভ অবশ্যই একজন মধ্যবয়সীর চেয়ে কম হবে। ফলে সে অন্তত প্রথমদিন থেকেই দুর্নীতি করতে শুরু করবে না কারণ তারুণ্যের একটা ধর্ম আছে, সে কিছু একটা করে দেখাতে চায়। কিন্তু এই গুণ একজন ৩৫ বছর বয়সী মানুষের কাছে না পাওয়ার চান্সই বেশী।

৯) একজন তরুণ অবশ্যই দেশকে বেশীদিন সার্ভিস দিতে পাড়বে। শিখতে শিখতে সে সচিব বা আইজি পর্যন্ত যেতে পাড়বে কিন্তু উল্লেখিতরা তা পাড়বে না। তারা মাঝপথেই থেমে যাবে।

১০) এরা প্রশাসনে জাঙ্ক হিসেবে ঢুকবে এবং একটা সময়ে দেখা যাবে- সে নিজে তো কিছু জানেই না উল্টো অন্যকেও শিখতে দিচ্ছে না।

[আমার দেখামতে, বর্তমানে অনেক সরকারী অফিসেই কম্পিউটারগুলো তাদের কাঙ্ক্ষিত সার্ভিস দিতে পারে না যোগ্য হাতে না পড়ার কারণে। আবার অনেক বড় বসেরই এতে কাজ করতে একজন করে অপারেটর লাগে। একটা কাজে- একজন মুখে বলে, একজন ড্রাফট লেখে আর একজন কম্পোজ করে! চেকিং, প্রিন্টিঙের কথা বাদ দিলাম!]

এই যদি অবস্থা হয় তাহলে এরা আগামীতে কি করবে? যেখানে টেকনোলজিতে প্রতি দুই-তিন বছরে ডাবল ডেভেলপমেন্ট হচ্ছে, বড় বড় প্রতিষ্ঠানই দেওলিয়া হয়ে যাচ্ছে? চোখের সামনে জায়ান্ট নোকিয়া, কোডাক বিলুপ্ত হয়ে গেল!

১১) বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হ্যাকিং থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। সেখানে তরুণ প্রজন্মের অফিসার থাকলে এই ঘটনা নাও ঘটতে পারতো। তাই আমি মনে করি- সরকারী চাকুরী পাওয়ার বয়সসীমা বর্তমান থেকে কমানো যেতে পারে, এতে করে টেকনিক্যালী ও শারিরিকভাবে সক্ষম তরুণ ছেলেমেয়েরা চাকুরী পাবে এবং দেশকে কাঙ্ক্ষিত সেবা দিবে।

১২) এই বয়সবৃদ্ধি চাকুরী পাওয়ার জন্য আরও অধিক মানুষকে একসঙ্গে ধাবিত করবে ফলে ঘুষের রেট ও স্বজনপ্রীতি আরও বাড়বে।

সুকান্ত কুমার সাহা (বিডিনিউজ২৪.কম ২০ মার্চ ২০১৬)