এক বুক ‘তৃষ্ণা’ নিয়ে ভেনিসে বাংলাদেশ

প্রকাশিতঃ মে ১২, ২০১৯ আপডেটঃ ৩:৪৮ অপরাহ্ন

শিরোনাম পড়ে একটু তালগোল পাকিয়ে যেতেই পারে৷ বাংলাদেশ, ভেনিস, কোথাওই তো পানির অভাব থাকার কথা না৷ তাহলে এ তৃষ্ণা কিসের! সে জবাব দিতেই ইটালির ভেনিসে আর্ট ফেস্টিভ্যালে যোগ দিয়েছেন পাঁচ বাংলাদেশি আর্টিস্ট৷

২০১৯ সালের লা বিয়েনালে ডি ভেনিৎসিয়ার শিরোনাম ‘মে ইউ লিভ ইন ইন্টারেস্টিং টাইমস’৷ আসলেই কি আমরা বেশ একটা ইন্টারেস্টিং টাইম বা মজার এবং কৌতুহলোদ্দীপক সময় পার করছি না?

রাজনীতি, অর্থনীতি, জলবায়ু, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, খেলাধুলা, বিজ্ঞান, এর সবকিছুতেই বেশ ইন্টারেস্টিং টাইমের বিষয়টাই দেখা যাচ্ছে৷ বিশ্বজুড়ে কট্টরপন্থিরা জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, উগ্রবাদের স্বর্ণযুগ চলছে দেশে দেশে, জলবায়ু সংকট চরমে পৌঁছালেও দিব্যি তা অস্বীকার করে চলেছে মানুষ৷ আবার বিজ্ঞানও সবকিছুকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে এগিয়ে চলেছে নিজের গতিতে৷ এই তো সেদিন ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণ গহ্বরের ছবিও তুলে ফেললেন মহাকাশ বিজ্ঞানীরা৷ এর আগে কে জানতো কৃষ্ণগহ্বরের ছবি আদৌ তোলা সম্ভব!

প্রশ্ন আসতে পারে, আর্টের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী? এর কোনো উত্তর নেই, বরং পালটা প্রশ্ন করা যেতে পারে, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে কিসের সম্পর্ক নেই?

৯০টি দেশের শিল্পী নিজেদের চিন্তা ও চিন্তার প্রতিফলন নিয়ে হাজির হয়েছেন বিয়েনালেতে৷ ঘানা, মাদাগাস্কার, মালয়েশিয়া ও পাকিস্তান এবারই প্রথমবারের মতো অংশ নিচ্ছে ভেনিস বিয়েনালেতে৷ ডমিনিকান রিপাবলিক এবারই প্রথম নিজেদের প্যাভিলিয়ন নিয়ে হাজির হয়েছে৷ এই শিল্পিদের কেউ চিত্রকর্ম, কেউ অডিও-ভিজ্যুয়াল পারফরম্যান্স, কেউ অন্য কোনো সৃষ্টিশীল উপায়ে ফুটিয়ে তুলছেন নিজেদের চিন্তাভাবনা৷

আষ্টেপৃষ্ঠে খাল দিয়ে প্যাঁচানো ভেনিসের মূল শহরে পালাৎসো সেনোবিও নামের এক ঐতিহাসিক ভবনে একটা অপরূপ খালের পাশেই হঠাৎ নজরে পড়বে একটা ব্যানার৷ গোটা গোটা ইংরেজি অক্ষরে লেখা– বাংলাদেশ৷ তারচেয়েও বড় করে লেখা ‘থার্স্ট’ বা তৃষ্ণা৷

দ্বিতীয় তলায় তিনটি কক্ষ জুড়ে ভেনিসের মাটিতেই যেন এক টুকরো বাংলাদেশ৷

কিছুক্ষণ পরপরই বিভিন্ন দেশের দর্শণার্থী আসছেন, বাংলাদেশের প্রখ্যাত ভিজ্যুয়াল আর্টিস্টদের একজন প্রীমা নাজিয়া আন্দালিবকে দেখা গেল ক্লান্তিহীন বর্ণনা করে যেতে৷ প্রীমার কাছে তৃষ্ণার অর্থ কী? তিনি বললেন, ‘‘নারীকে আমরা গলাকাটা হিসেবে দেখি, পুতুল হিসেবে দেখি৷ তাদের যেমন শুধু চেহারাই আছে, শরীর আছে, আর কিছু নেই৷ নারীদের পণ্য হিসেবেই দেখানো হয়৷”

নারীর অস্তিত্ব জানান দেয়ার যে আকাঙ্খা, সে তৃষ্ণাকেই চিত্রকর্মে এবং পারফরম্যান্সে ফুটিয়ে তুলেছেন প্রীমা৷ চিত্রকর্মে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতের কথাও, যাঁকে নির্দয়ভাবে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল৷

পরের কক্ষে শোভা পাচ্ছে বিশ্বজিৎ গোস্বামী এবং গাজী নাফিস আহমেদের শিল্পকর্ম৷ বিভিন্ন দেশের নারীদের নিয়ে তরুণ এই শিল্পীর ফটোগ্রাফি সিরিজ ‘মা’ সুনাম কুড়িয়েছে৷ রিক্সা আর্টে ‘মা’ লেখা নিয়ে বিশ্বজিৎ ঘুরে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন দেশে৷ অপরিচিত নারীদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় এই মা লেখার সূত্র ধরে৷ সাদাকালো ছবির সিরিজে নারীদের কোলে রঙীন ‘মা’ লেখাটা যে কারো নজর কাড়তে বাধ্য৷

বিশ্বজিৎ বলছেন, তাঁর মতে সম্পর্কের তৃষ্ণাটাই সবচেয়ে বড় তৃষ্ণা৷ আর সব সম্পর্কের মধ্যে সবচেয়ে বড় মা৷ মা-মাটি-মানুষ-ভাষা-স্বদেশ-প্রকৃতির সংযোগও বিশ্বজিৎ-এর অন্যতম কাজ৷ তিনি বলছেন, ‘‘জলেই আমরা আমাদের প্রতিবিম্ব দেখতে পাই, আবার সে জলই আমাদের তৃষ্ণা মেটায়৷ আমরা এই তৃষ্ণা নিয়েই জগৎ বুঝতে চাই, একে অপরকে বুঝতে চাই, জীবনের মাহাত্ম্য ও গল্প বুঝতে চাই৷”

একই কক্ষে বেশ কিছু স্থিরচিত্র নিয়ে হাজির গাজী নাফিস আহমেদ৷ তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জীবন ও তাঁদের লড়াই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা নিয়ে নাফিসের কাজ৷ অবহেলিত এই তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নিজেদের প্রকাশ করার অধিকারও সমাজে রাখেনি৷ নিজেদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক যে আকাঙ্খাগুলো, তা-ও তাঁরা আর দশটা মানুষের মতো স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ করতে পারেন না৷ তাঁদের সেই ভালোবাসার তৃষ্ণাটাই নানা ধরনের পোর্ট্রেটে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন নাফিস৷

নাফিস অবশ্য খুশি, সম্প্রতি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ বাংলাদেশে ভোটাধিকারের স্বীকৃতি পেয়েছেন৷ কিন্তু এতেই পুরো খুশি নন তিনি৷ তিনি বলছেন, ‘‘এই মানুষদের গল্প বলার তৃষ্ণা আমার মেটেনি৷ যাঁরা তাঁদের সম্পর্কে খুব ভালো জানেন না, আমি থার্ড পার্সন হিসেবে সে গল্পগুলো সবার কাছে পৌঁছে দিতে চাই৷”

এর পাশের কক্ষের ঠিক মাঝখানেই দেখা গেল বাঁশ দিয়ে তৈরি করা একটি ইন্সটলেশন– ফিডার অব থার্স্ট৷ এর পাশে দেয়ালে ঝুলছে ‘লাভ’ নামের একটি চিত্রকর্ম৷ এর দুটিই ডেনমার্ক-প্রবাসী শিল্পী রুহুল আমিন কাজলের, যিনি তাঁর ট্রাফিক আর্ট বা স্ট্রিট আর্টের জন্য আর এ কাজল নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত৷

কাজলের কাছে তৃষ্ণা একেবারেই ব্যক্তিগত ব্যাপার৷ এর সঙ্গে তাঁর নিজের জীবনের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘‘ভালোবাসার তৃষ্ণা থেকে মানুষ পরিবার তৈরি করে৷ সেখান থেকে একজন সন্তানেক তৃষ্ণা তৈরি হয়৷ আমার পরিবার হয়েছে, কিন্তু সন্তানের তৃষ্ণা মেটেনি৷”

কাজল ব্যাখ্যা করলেন, এই ইন্সটলেশনটি একটি ফিডার, যা দিয়ে শিশুদের দুধ খাওয়ানো হয়৷ আর এটি তৈরির জন্য যে বাঁশের প্রয়োজন হয়েছে, তার পুরোটাই আনা হয়েছে বাংলাদেশ থেকে, তাঁর নিজের বাড়ির বাঁশঝাড় থেকে কেটে৷

অন্য পাশের দেয়ালে শোভা পাচ্ছে তিনটি ক্যানভাস জোড়া দিয়ে বানানো একটি চিত্রকর্ম, সেটি ইটালি-প্রবাসী শিল্পী উত্তম কুমার কর্মকারের৷ তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন জলের তৃষ্ণাকেই৷

পানির অপর নাম জীবন হলেও মানুষ যেভাবে সে পানিকেই নষ্ট করে চলেছে, সে বিষয়ে মানুষকে সতর্ক করতে উত্তমের এই প্রচেষ্টা৷ ছবিতে শুধু রঙই না, নানারকম প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিনের ব্যবহার করে অদূর ভবিষ্যতের বিপদের আঁচ দেয়ার চেষ্টা করেছেন৷

তিনি বলছেন, ‘‘আমাদের চারপাশে সাগর, প্রচুর পানি, কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে একসময় আমরা পানিই পাবো না৷ আমরা যা বর্জ্য হিসেবে ফেলে দিচ্ছি, একসময় সেটা ঘুরে আমাদের কাছে চলে আসবে, আমরা সেটাই গ্রহণ করবো৷”

বাংলাদেশের প্যাভিলিয়নে এই বাংলাদেশিশিল্পীরা ছাড়াও, নরওয়ের শিল্পী হাইডি ফসলি এবং ইটালির তিন শিল্পি ফ্রাঙ্কো মারোক্কো, ডমিনিকো পেলেগ্রিনো এবং সান্দ্রো ভেরাগনোলোর শিল্পকর্মও স্থান পেয়েছে৷

ইটালির ভেনিসে এই দ্বিবার্ষিক আর্ট ফেস্টিভ্যাল চলবে ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত৷

এসএইচ-০৬/১২/১৯ (প্রবাস ডেস্ক)