গণহারে ফিরে আসছেন বাংলাদেশি শ্রমিকরা!

প্রকাশিতঃ নভেম্বর ৪, ২০১৯ আপডেটঃ ২:২২ অপরাহ্ন

সৌদি আরব থেকে বিপুল সংখ্যায় দেশে ফিরে আসছেন বাংলাদেশি শ্রমিকরা। নির্যাতনের শিকার হবার অভিযোগ তুলে আরো ফিরে আসছেন শত শত নারীকর্মী। এ নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ, কিন্তু এর পেছনে কারণটা কী?

চলতি বছর অন্তত ১৮,০০০ শ্রমিক সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে এসেছেন – বলছে এক পরিসংখ্যান। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা ।

দেশে ফেরা এবং এখনো না-ফেরা শ্রমিক, দূতাবাস এবং অভিবাসন বিশেষজ্ঞ – এরকম নানা পক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যাচ্ছে: এর পেছনে বড় কারণ হলো তথাকথিত সৌদি ‘ফ্রি ভিসা’, আর সৌদি আরবের নতুন শ্রমনীতি এবং অর্থনীতির নতুন বাস্তবতা।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক মাইগ্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন ১৫৩ জন শ্রমিক। পর দিন বৃহস্পতিবারও দেড়শজন শ্রমিক ফিরে আসার কথা ছিল।

ফিরে আসা শ্রমিকদের কেউ কেউ বলছেন, তাদের ইকামা বা কাজের বৈধতা থাকার পরও তাদেরকে ফিরে আসতে বাধ্য করা হয়েছে।

“ফ্রি ভিসায় কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের ইকামা ফি বাড়িয়ে দেয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে” – বলছিলেন সৌদি আরবে ১৬ বছর ধরে কর্মরত এস এম শামীম।

শামীমের অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশ থেকেই সবচেয়ে বেশি শ্রমিক ফ্রি ভিসায় সৌদি আরবে কাজ করতে যান। ভিসায় উল্লেখ থাকা নির্দিষ্ট কোম্পানির বাইরে কাজ করলে সেটি সৌদি আইনে এখন অবৈধ। কিন্তু ফ্রি ভিসায় গিয়ে আয় রোজগার বাড়াতে অনেকেই সে কাজটি করত বাধ্য হন।

“এখন সৌদি আরবের যে নতুন রুলস তাতে ওয়ার্ক পারমিটের ভেতর আপনার যে পেশা তার বাইরে আপনি কোনো কাজ করতে পারবেন না। কিন্তু ৪-৫ লাখ টাকা খরচ করে যারা এখানে আসে তারা ৬০০, ৭০০ বা ৮০০ রিয়াল বেতন পায় এই টাকায় তাদের হয় না। তখন তারা কী করে, ডিউটির পরে তারা বিভিন্ন জায়গায় কাজে যায়।”

“কিন্তু যদি সে ধরা পড়ে, তখন পুলিশ চাইলে তাকে পাঠায়ে দিতে পারে। এটাও একটা কারণ।”

এস এম শামীম বলেন, সব দেশের শ্রমিকদেরই একইভাবে ফেরত পাঠাচ্ছে সৌদি কর্তৃপক্ষ, তবে বাংলাদেশের শ্রমিকরা সংখ্যায় বেশি।

“এর আরেকটা কারণ হলো – সে স্পন্সরের সঙ্গে চুক্তি করে আসে যে তার ঐখানে কাজ করবে। ধরেন, ড্রাইভার হিসেবে গেল। কিন্তু সে গিয়ে সেখানে সুবিধা-অসুবিধা দেখে অন্য যায়গায় গিয়ে কাজ করা শুরু করলো।”

“কোনো শ্রমিক এভাবে কারো বাসা বা ফ্যাক্টরি থেকে বেরিয়ে গেলে ঐ মালিক তার বিরুদ্ধে একটা জিডি করে রাখে। এরপর ঐ শ্রমিক যখন ধরা পড়ে তখন তাকে বের করে দেয়।”

এ ছাড়া সৌদি সরকার ফ্রি ভিসার শ্রমিকদের জন্য ইকামা নবায়ন ফি-ও এখন বাড়িয়ে দিয়েছে। মি. শামীম জানান, “এখন ইকামা রিনিউ করতে লেবার অফিসের ফি হচ্ছে প্রতি মাসে ৬শ রিয়াল। কিন্তু ২০২০ সাল থেকে সেটি ৮শ রিয়াল করা হয়েছে। সৌদিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা বলছেন এ ফি-টা খুব বেশি, এটা পে করা অনেকের পক্ষেই অসম্ভব।”

শামীমের মতে – “এখন ফ্রি ভিসাতে কোনো লোকের কোনো অবস্থায়ই সৌদি আরব আসা যাবে না। কোনো লোকের আপন ভাই যদি বলে যে তুমি আসো তোমাকে ফ্রি ভিসায় নিয়ে আসতেছি, আমার পরামর্শ হইলো আপন ভাইয়ের কথাও শুনবেন না। বাংলাদেশ সরকারের উচিত ফ্রি ভিসার লোক পাঠানো পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া।”

এদিকে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট বা রামরু’র চেয়ারপারসন ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, সব দেশের শ্রমিকদের জন্য সৌদি সরকারের এটি অভিন্ন নীতি নিয়েছে। সৌদি সরকার গাড়ি চালনা এবং নানা পেশায় নারীদের সুযোগ দিয়েছে – ফলে এসব জায়গায় কর্মরত শ্রমিকরা সমস্যায় পড়ছে।

“তাদের যে তেলকেন্দ্রিক অর্থনীতি, তারা দেখতে পাচ্ছে যে আগামী দশ বিশ বছরের মাথায় সেই তেল থেকে ইনকাম ক্রমশ কমে আসবে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে আসবে। তাই তারা তাদের পুরো ইকনমিটাকে আবার ঢেলে সাজাচ্ছে। তাদের শ্রম ব্যবস্থার ভেতরে তাদের নিজ পপুলেশনকে প্রথমবারের মতো জোরের সাথে নিয়ে আসছে।”

রামরুর চেয়ারপারসন মিজ সিদ্দিকীও মনে করেন, ফ্রি ভিসার নামে যে ভিসা প্রচলিত ব্যবস্থায় বাংলাদেশি শ্রমিক সৌদি আরবে যাচ্ছে সেটা বন্ধ করা দরকার।

এদিকে, সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশি শ্রমিক ফেরত আসা নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষিতে রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস গত সপ্তাহে একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে।

সেখানে বলা হয়, “যদি কেউ স্পন্সরের বাইরে কাজ করে, পালিয়ে যায় কিংবা ইকামা, বর্ডার ও শ্রম আইনের কোনো ধারা ভঙ্গ করে তাহলে তাকে আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আটক করে সৌদি সরকারের অর্থায়নে ডিপোর্টেশন সেন্টারের মাধ্যমে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে পারে।

“এছাড়া সৌদি সরকার কর্তৃক সম্প্রতি কিছু পেশা ও সেক্টরে নন-সৌদিদের কাজ করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করায় ঐসকল পেশায় যদি কোনো প্রবাসী নিযুক্ত থাকেন, তিনি অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং এরকম অবৈধ প্রবাসীদেরও সৌদি কর্তৃপক্ষ আটক করে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়।”

কেউ নির্দোষ দাবি করলে তাকে দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগেরও পরামর্শ দেয়া হয়েছে ওই বিজ্ঞপ্তিতে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ১০ মাসে ৯৬০জন নারী শ্রমিক সৌদি আরব থেকে ফিরে এসেছে।

এর মধ্যে ৪৮জন নারীর মৃতদেহ এসেছে সৌদি থেকে। ফিরে আসা এই নারীদের বেশিরভাগই নির্যাতনের শিকার হবার অভিযোগ করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী জানান, নির্যাতন সইতে না পেরে পালিয়ে দূতাবাসে গিয়ে বাংলাদেশে ফিরেছেন তিনি। তিনটি বাসা পরিবর্তন করেও একই অভিজ্ঞতার শিকার হন এই নারী।

“ওদের কথা হচ্ছে, টাকা দিয়ে ওরা কিনে আনে। ওরা যখন যেটা ইচ্ছা মন যা চাইবে তাই করাবে। কোনো বাধা দিতে পারবা না। আমি তিনটা বাসা চেঞ্জ করছি। তিনটা বাসাতে একই কাহিনী। আমি অ্যাম্বাসিতে যখন গেছি, চারশ মেয়ে পাইছি। সবারই কিছু না কিছু এরকম অভিজ্ঞতা।”

শ্রমিক পাঠানোর সাথে জড়িত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর পক্ষে বলা হচ্ছে, পুরুষ শ্রমিকদের ফিরে আসাটা স্বাভাবিক।

বায়রা মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান জানান, সৌদিতে প্রায় ১৮ লাখ শ্রমিক কাজ করছে। প্রায় চার লাখের মতো নারী শ্রমিক আছে।

নোমান বলেন, প্রতিমাসে যত শ্রমিক বিদেশে যাচ্ছে তার প্রায় ষাট শতাংশ সৌদিতে যাচ্ছে।

“যে পরিমাণ লোক গিয়েছে, যে পরিমাণ চাকরি করছে সে তুলনায় যে পরিমাণ ফেরত আসছে সেটাকে ব্যাপক বলা যায় না” – বলেন তিনি।

“নারী শ্রমিকদের নিয়ে আমরা স্টাডিতে দেখেছি ৬০-৭০% শ্রমিক ফেরত আসছে হোম সিকনেস, ফুড হ্যাবিট এবং ওয়ার্কলোড নিতে না পারার কারণে। আর ২০ শতাংশের মতো নারী বিভিন্ন রকম অ্যাবিউজ হচ্ছে।”

“সেটা কেন হচ্ছে? আমরা যদি সেইসব নিয়োগকারীদের চিহ্নিত করতে পারি এবং তাদেরকে আর পাঠাবো না সেটা হতে পারে। ট্রেনিংয়ে যদি ঘাটতি থাকে সেটা আমাদের পূরণ করা দরকার” – বলেন নোমান।

এসএইচ-০৬/০৪/১৯ (আবুল কালাম আজাদ, বিবিসি)