বিজনেস স্টুডেন্টরাই ভালো করে শিখছে না ই-কমার্স

বাংলাদেশে ই-কমার্স নিয়ে এক অদ্ভুত সার্কাস চলছে। যাই হোক,প্রথমে অন্য বিষয়ে আসি।
আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক (বিজনেস ফ্যাকাল্টির) জিজ্ঞাসা করছে, “তানভীর, অনলাইনে মানুষ ব্যবসা করে কিভাবে রে?” এই প্রশ্নটা শুনে আমি খুব একটা অবাক হইনি। কারণ, বিবিএ কিংবা এমবিএর সিলেবাসে এখনও পর্যন্ত ই-কমার্স বিজনেস, ডিজিটাল মার্কেটিং, বিজনেস মডেল নিয়ে আলোচনা করা হয়না, শুধু মাত্র অনলাইন বিজনেসের সংজ্ঞা ছাড়া।

তাই একাডেমিক কোন পড়া লেখাই হয় না বাংলাদেশে ই-কমার্স বা অনলাইন বিজনেস নিয়ে। তার মানে বিজনেস এর স্টুডেন্টরাই ভালো করে শিখছে না ই-কমার্স কি আর আম জনতা তো দূরের কথা।

এবার আসি আম জনতার কথা…
আপনার যদি অলস টাকা পড়ে থাকে, আপনি যদি মনে করেন টাকাগুলো কোথাও ইনভেস্ট করে প্রফিট জেনারেট করবেন তাহলে তার জন্য আইন সিদ্ধ প্লাটফর্ম হলো স্টক মার্কেট। এটা শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বেই মানুষ টাকা ইনভেস্ট করে থাকে স্টক মার্কেটের এনলিস্টেড কোম্পানিতে । যেখানে বছর শেষে কোম্পানির সকল শেয়ার হোল্ডারকে ডিভিডেন্ট বা লভ্যাংশ দেয়া হয়। কিন্তু আমরা বাঙালী জাতি বিভিন্ন ই-কমার্স কোম্পানির ডিস্কাউন্ট(অস্বাভাবিক) পণ্য কিনে রিসেল করে টাকা কামানোর উদ্দেশ্যে অনেক অনেক প্রডাক্ট অর্ডার করি।

কিন্তু যখন আর সময় মতো প্রোডাক্ট হাতে পাই না তখন আমরা বলি এই সাইটে, ঐ সাইটে আমি ৫০ লাখ টাকা ইনভেস্ট (৩০+ বাইক অর্ডার করেছে) করে আজ আমি সর্বশান্ত। এবং এই কথা শোনার সাথে সাথে সাংবাদিক ভাইরাও টিভিতে বলা শুরু করল অমুক ই-কমার্স সাইটে সাধারন মানুষ টাকা ইনভেস্ট করে জনগনের মাথায় হাত।

ও সাংবাদিক ভাইদের কথা যেহেতু চলেই এলো,এবার তাদের নিয়ে দুই লাইন লিখি।

আমার এই সাংবাদিক ভাইয়ার হলেন সব বিষয়ের বিশেষজ্ঞ। তারা মোটামুটি সকল বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারেন তা তিনি সেই বিষয় সম্পর্কে জানেন বা নাই জানেন। একবার এক জাতীয় দৈনিকে এক সাংবাদিক লিখে দিলেন রাজশাহীতে আমে ফরমালিন দেয়া হয়।ব্যাস আমার ইন্ডাস্ট্রির ১৫ টা বাজিয়ে দিলেন। আসলে সেই সাংবাদিক জানেনই না যে ফরমালিন কি, ফরমালিন কোথায় ব্যাবহার করা হয়। সাধারণত আমে এমনিই প্রাকৃতিক ভাবে ৪% ফর্মালিন আল্লাহ দিয়ে দেন যেন আম পাকার পর ২, ১ দিন যেন আমরা রেখে খেতে পারি। কিন্তু, তার ওই একটি শব্দ ব্যবহারেই আম শিল্পের অবস্থা শেষ। এটা সত্যি যে, অনেক অসাধু আম ব্যবসায়ী অগ্রিম বাজারে আম নামানোর জন্য এবং অধিক মুনাফার জন্য কাঁচা ও অপরিপক্ক আমে ইথোফেন ব্যবহার করে থাকে যা অবশ্যই নেতিবাচক।

যাই হোক আবার ফিরে আসি ই-কমার্সে, তো সেই সাংবাদিক কাস্টোমারের দুঃখে দুঃখিত হয়ে টিভি নিউজের জন্য মন্ত্রীকে প্রশ্ন করে ফেলল যে, মন্ত্রী মহোদয় এই যে সাধারন মানুষ ই-কমার্স সাইটে ইনভেস্ট করে সর্বশান্ত হচ্ছে আপনারা কিছু করছেন না কেনো?

এবার মন্ত্রী মহোদয় ও নিজের পিছন বাঁচানোর জন্য বললেন,হ্যাঁ বিষয়টা গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। যারা যারা ই-কমার্স সাইটে ইনভেস্ট করে সর্বশান্ত হয়েছেন তাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কিছু একটা করবো এবং যে সকল ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান সাধারন মানুষের ইনভেস্টমেণ্ট নিয়ে প্রতারনা (মন্ত্রী সাহেব ই-কমার্স কে প্রতারক প্রতিষ্ঠান বানিয়ে দিলেন) করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমরা খুব শীঘ্রই ই-কমার্স নিয়ে নীতি মালা প্রকাশ করবো।

আরে ভাই ই-কমার্স থেকে মানুষ পণ্য কেনে, কোনও টাকা লগ্নি করেনা।

যাই হোক এবার আসি ই-কমার্স নীতিমালা নিয়ে। যেই কর্তা ব্যক্তিবাবুরা ই-কমার্স নীতিমালা করবেন তারা নিজেরাই ই-কমার্সের ই বুঝে না। এবার তারা ডাকলেন ই-কমার্স ইনফ্লুয়েন্সার গ্রুপের বিশেষজ্ঞদের যাদের নিজেদের কোন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান নেই। শুধু মাত্র ফেসবুকে ই-কমার্স নিয়ে লিখা লিখি, ফেসবুক গ্রুপ খুলে নিজেদের এডমিন জাহির করা ছাড়া। তারা এসে পরামর্শ দিলেন যে আমরা যদি স্ক্রু পেমেন্ট মেথড এনশিউর করতে পারি তাহলে ক্রেতাদের টাকা মেরে কেউ বিদেশ পালাতে পারবেনা। ব্যাস ই-কমার্সের কফিনে লাষ্ট পেরেক মারা শেষ।

আরে ভাই ফিজিক্যাল দোকান আর ই-কমার্স বিজনেস সিস্টেম তো একই। একটা ফিজিক্যালি আছে আরেকটা ভার্চুয়াল। অনলাইনের প্রডাক্ট এবং রিভিউ দেখে প্রডাক্ট অর্ডার করবেন। নির্দিষ্ট সময় পর প্রডাক্ট ডেলিভারি নিবেন। এটাই স্বাভাবিক। প্রোডাক্ট পছন্দ না হলে রিটার্ন করবেন। যাই হোক, নীতিমালা বানানোর সময় ডাকা উচিত ছিলো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মালিকদের যারা কোটি কোটি টাকা ইনভেষ্ট করে প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছেন।

প্রতিটা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কিছু পলিসি থাকে। কেউ বেশি ডিস্কাউন্ট দিয়ে কাস্টমার বেজ বানিয়ে ফেলেন, তার পর ধীরে ধীরে ব্রেক ইভেন্ট পয়েন্টে আসে। তারপর একটা পর্যায়ে গিয়ে প্রোফিট করে।এতে অনেক কোম্পানির ১০ বছরও সময় লাগতে পারে।

অথচ আমাদের দেশে সময়মতো না নীতিমালা,না মনিটরিং হুট করেই সকলের সাথে তাল মিলিয়ে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মালিক গুলো কে জেলে ভরে,প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক একাউন্ট ফ্রিজ করে, স্বাভাবিক বিজনেস বন্ধ করে বাংলাদেশের ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রিকে শেষ করে দেয়ার শেষ প্রান্তে নিয়ে যাওয়া হলো।

কিন্তু দেখবেন একদিন অ্যামাজন,ই বে, ফ্লিপকার্ট বাংলাদেশে এই সেম বিজনেস চালু করে নাকের ডগার উপর দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাবে সেই দিন আপনারা তাকিয়ে থেকে দেখবেন।

যারা অনৈতিক ভাবে ক্রেতার টাকা মেরে দেয়ার উদ্দেশে ই-কমার্স বিজনেস চালু করেছে আমি তাদের বিপক্ষে, হয় তাদের নীতিমালার মধ্যে বিজনেস করতে হবে। আর তা না করলে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

শেষ কথা ভাই সঠিক জায়গায় টাকা ইনভেস্ট করুন আর সঠিক ই-কমার্স সাইট থেকে পণ্য কিনুন।

জানেনতো লোভে পাপ আর পাপে কবরস্থান।

আমার এই লেখা একান্তই আমার অভিমত আপনি আমার সাথে দ্বিমত পোষণ করতেই পারেন।
ও আরেকটা কথা দেশে এখন ভালো সাংবাদিক আছেন যারা বুঝে শুনেই লেখেন বা টিভি রিপোর্ট করেন।

এসএইচ-২৩/২৭/২১ (হাসান তানভীর, রাজশাহী, smmhasantanvir@gmail.com, লেখকের নিজস্ব মতামত। এর সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই)