বন্ধ হোক মিথিলাকে ‘ভার্চুয়াল ধর্ষণ’

প্রকাশিতঃ নভেম্বর ৭, ২০১৯ আপডেটঃ ২:৩২ অপরাহ্ন

আলোচিত মডেল ও অভিনেত্রী রাফিয়াত রশিদ মিথিলার সঙ্গে ছোটপর্দার নির্মাতা ইফতেখার আহমেদ ফাহমির পুরনো কিছু ঘনিষ্ঠ ছবি ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়। এতে মুহূর্তের মধ্যে ঝড় উঠে ফেসবুক ও দেশের সব গণমাধ্যমে। ডয়চে ভেলে’র সংবাদভাষ্য।

এরই মধ্যে মিথিলা ব্যক্তিগত ছবি ফাঁস করায় সাইবার অপরাধ বিভাগে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ জানিয়েছেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়াও চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। বিষয়টি নিশ্চিত করে একটি স্ট্যাটাসও দিয়েছেন এই অভিনেত্রী।

গত ৪৮ ঘণ্টা ধরে ফেসবুকে ভাসছে কিছু ছবি। কেউ সেসব ছবি শেয়ার করছেন, কেউবা তা প্রকাশের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। একজন অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত ছবি নিয়ে কুরুচিকর মন্তব্যের প্রতিবাদের মধ্যে আশার আলো দেখছি আমি।

মাঝে মধ্যেই পত্রিকার পাতা খুললেই দেখি, অমুক এলাকায় তমুককে ধর্ষণ, ভিডিও প্রকাশের হুমকি। অর্থাৎ ধর্ষক শুধু ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হয়নি, তার সেই বীভৎস অপরাধের ভিডিও করে রেখেছেন। আর হুমকি দিয়েছেন, যদি ধর্ষণের কথা সেই নারী প্রকাশ করেন, তাহলে তার ভিডিও প্রকাশ করে দেবেন।

গণমাধ্যমে এরকম কিছু ঘটনার কথা মাঝে মাঝে প্রকাশ পায়। তবে, ধারণা করি অনেক নারী হয়ত নিজের একান্ত গোপন মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও প্রকাশ হওয়ার ভয়ে চুপ করে থাকার পথই বেছে নেন। আর সেই চুপ করে থাকার সুযোগ নিয়ে তাদের শারীরিক-মানসিক ধর্ষণ করা হয়।

নারীদের এই যে গোপন ছবি-ভিডিও প্রকাশ হওয়ার ভয়, এই ভয় কাটানো জরুরি বলে আমি মনে করি। কেননা এই ভয় শুধু ধর্ষণের মতো ঘটনাকে আড়াল করতে নয়, সামাজিকভাবে নারীকে নানাভাবে হেয় করার মতো কাজেও ব্যবহারের চেষ্টা রয়েছে। নারীকে দাবিয়ে রাখার এক উপায় হয়ে উঠেছে এটি।

তাই নারীর মন থেকে এই অহেতুক ভয় দূর করাটা জরুরি। আর এক্ষেত্রে এক চমৎকার উদাহরণ হতে পারে অভিনেত্রী রাফিয়াত রশিদ মিথিলা ও তাঁর এক প্রাক্তন ছেলেবন্ধুর প্রকাশিত ব্যক্তিগত ছবিগুলো। বর্তমান যুগে দুজন প্রেমিক-প্রেমিকা হরহামেশা যেসব ছবি তোলেন, এগুলোও সেরকমই ছবি। যে যেভাবেই হোক, অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এবং প্রচলিত আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে ছবিগুলো প্রকাশ করে দিয়েছেন। আর তাই নিয়েই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে বিতর্ক।

ফেসবুকে আমি দেখেছি অনেকে সেসব ছবি প্রকাশের মাধ্যমে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ আবার মিথিলার এই সম্পর্ককে ‘অবৈধ, অনৈতিক, অসামাজিক’ ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে নিন্দা করছেন। ভাবখানা এমন তারা বুঝি সমাজের বড় বড় রক্ষক। অথচ তাদের অনেকের ফেসবুক প্রোফাইল একটু ঘাটলেই দেখা যাবে এমন সব ফেসবুক পাতা, গ্রুপে তাদের বিচরণ, যার সঙ্গে তাদের এই রক্ষকের ভূমিকা একেবারেই বেমানান।

যাক সেকথা, মিথিলা বিতর্কের ইতিবাচক দিকটাতে আসি এবার। ফেসবুকে গত দুদিনে আমার বন্ধু তালিকার অনেককে মিথিলার পাশে দাঁড়াতে দেখেছি। এক তরুণী তো রীতিমত ফেসবুক লাইভে এসে জানতে চেয়েছেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী তাঁর ব্যক্তি জীবনে কী করবেন, কার সঙ্গে দেখা করবেন, কার সঙ্গে থাকবেন, তাতে অন্যের কী!

আমি এই তরুণীর সঙ্গে পুরোপুরি একমত। একমত তাঁর মতো আরো অসংখ্য মানুষের সঙ্গে যারা মনে করেন মিথিলার ব্যক্তিগত ছবি তাঁর সম্মতি ছাড়া প্রকাশের মাধ্যমে চরম অন্যায় করা হয়েছে। এটা একজন ব্যক্তির গোপনীয়তার চরম লঙ্ঘন।

জার্মানিতে দেখেছেন ব্যক্তির গোপনীয়তা অত্যন্ত কঠোরভাবে রক্ষা করা হয়। এদেশে একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত পরিসরের ছবি তার অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা গুরুতর অপরাধ। একজন চিকিৎসক তাঁর রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য বিনা অনুমতিতে তৃতীয় কারো সঙ্গে শেয়ার করতে পারেন না। গণমাধ্যম চাইলেই সন্দেহভাজন কোনো ব্যক্তির ছবি প্রকাশ করতে পারে না। এমনকি নিরাপত্তার খাতিরে যেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো আছে, সেখানে সে সংক্রান্ত নোটিশ ঝুলিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক। এদেশের আদালতে অনেক সময় গোপনে ধারণ করা ভিডিও কোনো ঘটনার প্রমাণ হিসেবে আমলে নেন না, যদি সেটা অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তিগত পরিসরে ধারণ করা হয়ে থাকে।

আমাদের সমাজে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার এসব ব্যাপার এখনো আসলে সেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই সংক্রান্ত জ্ঞানের ঘাটতি আছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। তবে, ব্যক্তিগত ছবি নিয়ে মিথিলার সঙ্গে যা করা হয়েছে, সেসব ঠেকানোর আইন রয়েছে। আশার কথা হচ্ছে, এই অভিনেত্রী আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন। ফেসবুকে তাঁর ছবি নিয়ে যে নোংরামি চলছে তাকে তিনি তুলনা করেছেন ‘ভার্চুয়াল ধর্ষণের’ সঙ্গে, আর সেই ধর্ষণের বিচার দাবি করেছেন তিনি।

আমি মনে করি, গোপন ছবি প্রকাশের ‘ভয়ে’ কুঁকড়ে না গিয়ে মিথিলার এই প্রতিবাদ আরো অনেক নারীকে সাহসী করে তুলবে। তারা বুঝবে সামান্য কয়েকটি ছবি একজন মানুষের পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা ঠিক করে দেয় না। বরং নারীর এই অহেতুক ভয় যতই কেটে যাবে, নারী স্বাধীনতার পথ ততই প্রশস্ত হবে।

আরএম-০৫/০৭/১১ (বিনোদন ডেস্ক)