শীত লাগেনি মুক্তিপাগল বাঙালীর গায়ে

প্রকাশিতঃ ডিসেম্বর ৪, ২০১৮ আপডেটঃ ১২:০২ পূর্বাহ্ন

বিজয় মাসের আজ চতুর্থ দিন। হাজার বছর ধরে স্বাধীনতাহীন বাঙালী জাতি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ অর্জন করেছে এ মাসেই। আর এ অর্জনে দিতে হয়েছে এক সাগর রক্ত আর লাখো মা-বোনের সম্ভ্রম। যতদিন এ পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশের অস্তিত্ব থাকবে ততদিন ডিসেম্বর বিজয়ের মাস হিসেবে উদযাপিত হবে। মহান মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি, ঘাতক দালাল রাজাকার, আলবদর, যুদ্ধাপরাধী ও তাদের দোসররা যুগ যুগ ধরে ভীষণ ভয়ে থাকবে, বাঙালীর তীব্র ঘৃণা ও ধিক্কার থেকে নিজেদের আড়াল করার চেষ্টা করবে এ মাসে।

৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১। ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধ এক ভিন্ন মাত্রা পেতে শুরু করে। বর্ষা, শরত আর হেমন্ত পেরিয়ে শুরু হয় শীতের মৌসুম। গ্রামবাংলা জুড়ে শীত নামে। কিন্তু শীত নেই মুক্তিপাগল বাঙালীর। হানাদারবাহিনীকে পরাজিত করতে দেহের রক্ত যেন টগবগিয়ে ফুটছে। একাত্তরের রক্তক্ষরা এই দিনে চারিদিকে বীর বাঙালীর বিজয়, আর পাকহানাদার বাহিনীর পরাজয়ের খবর। দেশের বিভিন্নস্থানে পর্যুদস্ত হতে থাকে উর্দুভাষী হানাদাররা। ডিসেম্বর মাসের প্রতিটিদিনই শত্রুর পরাজয়ের ক্ষণ গণনা চলছিল। এক একটি দিনে রচিত হচ্ছিল বাঙালীর বীরত্বগাথার নিত্যনতুন ইতিহাস। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও মহান মুক্তিযুদ্ধের সেসব বীরত্বগাথা ইতিহাস আমাদের নতুন করে বাঁচার আশা জাগায়।

ডিসেম্বরের শুরু থেকেই দখলদার পাকহানাদারদের পরাজয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে পাকিস্তানীরা সশস্ত্র যুদ্ধের পাশাপাশি কূটনৈতিক যুদ্ধও শুরু করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানীদের ষড়যন্ত্রের দোসর হয়ে ওঠে। কিন্তু তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন অকৃপণ সহযোগিতায় সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়। ৪ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রশ্ন তোলে। কিন্তু ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের কারণে সেই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হয়নি।

একাত্তরে এই দিন সকালে নয়াদিল্লীতে প্রবাসী সরকার এবং ভারতীয় প্রতিরক্ষা দফতরের প্রধানরা আলোচনায় বসে দেখলেন যৌথ বাহিনী ঠিক ঠিকই এগিয়েছে। প্রথমত: তারা কোথাও শহর দখলের জন্য অগ্রসর হয়নি।

দ্বিতীয়ত: কোথাও শত্রু পাকিস্তানী ঘাঁটির সঙ্গে বড় লড়াইয়ে আটকে পড়েনি।

তৃতীয়ত: পাকিস্তানী সমরনায়করা তখনও বুঝতে পারেনি ভারতীয় বাহিনী ঠিক কোন দিক দিয়ে ঢাকায় পৌঁছতে চাইছে। বরং তখনও তারা মনে করছে ভারতীয় বাহিনী সীমান্তের মূল পাকিস্তানী ঘাঁটিগুলোর ওপর আক্রমণ চালাবে।

চতুর্থত: ব্যাপক বিমান এবং স্থল আক্রমণে শত্রুপক্ষকে একেবারে বিহ্বল করে দেয়া গিয়েছিল। পঞ্চমত: পাকিস্তানী বিমান বাহিনীকে অনেকটা ঘায়েল করে ফেলা হয়েছে। তাদের বিমান ঘাঁটিগুলোও বিধ্বস্ত।

ষষ্ঠত: পাকিস্তানের প্রধান নৌবন্দরগুলো অর্থাৎ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, চালনা, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জে জাহাজ বা স্টিমার ভেড়ানোর ব্যবস্থাও অনেকটা বিপর্যস্ত এবং সপ্তমত: বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিক এবং বাড়িঘরও মোটেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী তাই যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনেও একই লক্ষ্যে এগিয়ে চলল।

পশ্চিম দিক থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিফৌজের সব কয়টা কলাম সামনে এগিয়ে চলল। কিন্তু কোথাও তারা সোজাসুজি পাকিস্তানী ঘাঁটিগুলোর দিকে এগুলো না। মূল বাহিনী সর্বদাই ঘাঁটিগুলোকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলল এবং ঘাঁটিতে অপেক্ষমাণ পাকিস্তানী বাহিনী যাতে মনে করে যে, ভারতীয় বাহিনী তাদের দিকেই এগিয়ে আসার চেষ্টা করছে। সেজন্য প্রতি পাকিস্তানী ঘাঁটিতে অবিরাম গুলিবর্ষণও চলতে থাকল। এ উদ্দেশ্যে প্রতি পাকিস্তানী ঘাঁটির সামনে ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনীর কিছু কিছু সদস্য রেখে যাওয়া হলো।

মূল ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী যে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তানীরা তার খবরও পেল না। কারণ প্রথমত, তাদের সমর্থনে দেশের জনগণ ছিল না, যারা খবরাখবর দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, তাদের বিমান বাহিনী তখন বিধ্বস্ত। তৃতীয়ত, বাংলাদেশে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বেতারে খবরাখবরের ব্যবস্থাও ভাল ছিল না। সুতরাং নিজস্ব ব্যবস্থায়ও তারা খবরাখবর পেল না। তাই ভারতীয় বাহিনী যখন সোজাসুজি যশোর, হিলি, সিলেট, কুমিল্লা, ফেনী প্রভৃতি পাকিস্তানী বাহিনীর শক্ত ঘাঁটির দিকে না গিয়ে যে তারা সোজা চলে যাচ্ছে তা তারা কোনভাবেই বুঝতে পারল না।

বরং ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনীর গোলাবর্ষণের বহর দেখে তখনও তারা মনে করছে ভারতীয় বাহিনী তাদের দিকেই এগোনোর চেষ্টা করছে। সেজন্য তারা তখনও মূল সড়কগুলো আগলে বসে রইল। সীমান্তের কাছাকাছি পাকিস্তানী বাহিনী তখনও অধিষ্ঠিত একমাত্র কুষ্টিয়া ছাড়া। দর্শনা যে মুহূর্তে ৪নং পার্বত্য ডিভিশনের কামানের পাল্লার মধ্যে এসে গেল পাকিস্তানীরা অমনি শহর ছেড়ে আরও পশ্চিমে পালাল।

এদিকে ভারতীয় বিমান ও নৌবাহিনীর জঙ্গী বিমানগুলো বারবার ঢাকা, চট্টগ্রাম, চালনা প্রভৃতি এলাকায় সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর আক্রমণ চালায়। ঢাকায় সেদিনও জোর বিমানযুদ্ধ হলো। কিন্তু সেদিনই প্রায় শেষ বিমানযুদ্ধ। অধিকাংশ পাকিস্তানী বাহিনী ঘায়েল হলো। বিমানবন্দরগুলোও প্রচন্ড ক্ষতিগ্রস্ত হলো।

এসএইচ-০১/০৪/১২ (অনলাইন ডেস্ক)