ব্ল্যাকহেড মুক্ত ত্বক : কী কী করবেন ও কী কী করবেন না

ব্ল্যাকহেড

ব্ল্যাকহেডস আসলে কী?

আমাদের ত্বকে রয়েছে অসংখ্য লোমকূপ যা দ্বারা ত্বক নিঃশ্বাস নেয়। কখনো কখনো মৃতকোষ ও ত্বক থেকে নিঃসৃত তেল লোমকূপের গোড়ায় জমে গোড়াগুলো বন্ধ হয়ে যায়, এভাবেই ব্ল্যাকহেডসের জন্ম হয়। ত্বকের স্বাভাবিক মেলানিন এবং তেল বাতাসের সংস্পর্শে এলে তা অক্সিডাইজ হয়ে কালো রঙ ধারণ করে। রঙ কালো দেখানোর কারণে অনেকেই ব্ল্যাকহেডসকে ময়লা ভেবে ভুল করেন। কিন্তু আসলে ময়লার সাথে ব্ল্যাকহেডসের কোনো সম্পর্ক নেই। আপনার চেহারায় ব্ল্যাকহেডস থাকা মানে এই নয় যে, আপনি অপরিচ্ছন্ন। ব্ল্যাকহেডস সাধারণত থুতনি, নাক ও নাকের আশপাশের অংশেই বেশি দেখা যায়। ব্ল্যাকহেডস অনেক সময় বংশগত কারণেও হয়ে থাকে। এ ছাড়া গর্ভাবস্থায়, টিনেজ বয়সে ব্ল্যাকহেডসের উপদ্রব হয়ে থাকে। বিভিন্ন ওষুধ যেমন করটিকস্টারয়েড, অ্যান্ড্রজেন বা জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল সেবন করলেও ব্ল্যাকহেডস হতে পারে। হতাশার কথা হলো, ব্ল্যাকহেডসের পেছনের সবগুলো কারণ এখনো পুরোপুরিভাবে আবিষ্কৃত হয়নি।

ব্ল্যাকহেডস দূর করতে কিছু উপাদান এড়িয়ে চলুন

অনেক প্রসাধনী আছে যা ত্বকের তেল নিঃসরণের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে ব্ল্যাকহেডস সমস্যা আরো জটিল করে তুলতে পারে। এসব সমস্যা হয় কিছু উপাদানের কারণে যা বিভিন্ন প্রসাধনীতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এসব উপাদানের মধ্যে আছে অ্যালকোহল, পেপারমিন্ট, মেন্থল, লেবু ও ইউক্যালিপ্টাস। যেসব প্রসাধনী তৈরিতে এসব উপাদান ব্যবহার করা হয়, সেসব উপাদান এড়িয়ে চলুন। সাবান দিয়ে মুখ ধোবেন না। সাবানকে শক্ত আকৃতি দেয়ার জন্য যে উপাদান ব্যবহার করা হয় তা মুখের লোমকূপ বন্ধ করে দিয়ে ত্বকে ব্ল্যাকহেডস ও অস্বস্তিকর অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারে।

স্ক্রাবিং

ব্ল্যাকহেডস কখনো স্ক্রাবিং করে দূর করা যায় না। ব্ল্যাকহেডস লোমকূপের এত গভীর পর্যন্ত থাকে যে স্ক্রাবিং করে তা নির্মূল হবে না, উল্টো অতিরিক্ত স্ক্রাবিং করার ফলে ত্বকে জালাপোড়া হতে পারে। ত্বক বেশি ঘষলে বা স্ক্রাবিং করলে ত্বকের সেবাম উৎপাদনও বৃদ্ধি পায়। স্ট্রিপ ব্যবহার করলেও ব্ল্যাকহেডস একেবারে দূর হয় না, শুধু ক্ষণকালের জন্য ব্ল্যাকহেডসের উপরি ভাগ দূর হয়। তাই প্রয়োজনের অতিরিক্ত স্ক্রাবিং করা যাবে না, বা স্ট্রিপ্সও ব্যবহার করা যাবে না।

ট্রপিকাল রেটিনয়েড

রেটিনয়েড হতে পারে ব্ল্যাকহেডস থেকে মুক্তির পথ। সঠিক পরিমাণে ও সঠিক নিয়মে ব্যবহার করলে ব্ল্যাকহেডস দূর হবে অচিরেই। রেটিনয়েড কোষের আঠালোভাব দূর করে এবং নতুন কোষ উৎপাদন করে, ফলে ব্ল্যাকহেডস দূর হয়। যাদের ত্বক সেনসিটিভ তারা ০.৫ শতাংশ রেটিনল ক্রিম বা এমন প্রসাধনী ব্যবহার করতে পারেন যাতে আছে রেটিনল। রেটিনল ব্ল্যাকহেডসকে বাড়তে দেয় না। যাদের ত্বক সেনসিটিভ নয়, তারা ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ট্রপিকাল রেটিনয়েড ব্যবহার করতে পারেন।

স্যালিসাইলিক এসিডযুক্ত স্ক্রাব

স্যালিসাইলিক এসিডযুক্ত স্ক্রাব ব্যবহার করে আলতো করে ত্বকের উপরি ভাগ পরিষ্কার করতে হবে। স্ক্রাব করার ফলে ব্ল্যাকহেডস দূর হবে না কিন্তু ত্বকের মৃতকোষ দূর হবে, স্ক্রাবে থাকা স্যালিসাইলিক এসিড তখন পোরে ঢুকতে পারবে সহজেই। এতে পোরগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার হবে। তবে মনে রাখতে হবে, তৈলাক্ত ত্বকের অধিকারীদের সপ্তাহে তিনবারের বেশি স্ক্রাব ব্যবহার করা উচিত নয়। অন্য দিকে যাদের ত্বক শুষ্ক তারা সপ্তাহে দু’বার ও সেনসিটিভ ত্বকের অধিকারীরা সর্বোচ্চ একবার স্ক্রাব ব্যবহার করতে পারবেন।

ক্ল্যারিসনিক ব্রাশ বা সনিক ক্লিনজিং সিস্টেম

ইলেকট্রিক ক্ল্যারিসনিক ব্রাশ খুব সুন্দরভাবে ত্বক পরিষ্কার করতে সক্ষম, যা খালি হাতে করা সম্ভব না। খেয়াল রাখবেন, এটি যেন অতিরিক্ত ব্যবহার না করা হয়। সপ্তাহে এক থেকে দু’বার ব্যবহার করাই যথেষ্ট।

ময়েশ্চারাইজ করুন

ত্বকে ব্রণ বা ব্ল্যাকহেডস থাকুক বা না থাকুক, ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক। ব্ল্যাকহেডস দূর করার জন্য রেটিনয়েড ক্রিম ব্যবহার বা স্ক্রাবিং করার ফলে তা ত্বককে শুষ্ক করে ফেলতে পারে, তাই ত্বক সঠিকভাবে ময়েশ্চারাইজ করতে হবে। এতে করে ত্বক নরম থাকবে, ফেটে যাবে না। ফলে ব্ল্যাকহেডস দূর করার জন্য স্ক্রাবিং বা অন্য কোনো পদ্ধতি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সুবিধা পাবেন। যাদের ত্বক শুষ্ক, তারা প্রথমে ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে তার ওপর রেটিনয়েড ক্রিম ব্যবহার করুন।

প্রোফেশনাল সমাধান

ঘরে বসে যদি কোনোভাবেই ব্ল্যাকহেডস দূর করতে না পারে, তখন অন্য উপায় আছে আপনার জন্য, কিন্তু সেগুলো একটু খরচ ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। লাইট পিল করাতে পারেন। এতে বন্ধ লোমকূপের মুখ খুলবে এবং ব্ল্যাকহেডস ও হোয়াইটহেডস দূর হবে। মেডিক্যাল ফেসিয়াল ও মাইক্রোডারমাব্রেসন ও একই উপকার করতে সক্ষম।

কিছু ঘরোয়া সমাধান

ঘরে বসেও তৈরি করে নিতে পারেন ব্ল্যাকহেডস দূর করার কার্যকরী প্রসাধনী। এতে যা যা উপকরণ লাগে সব আপনার রান্নাঘরেই আছে, দামও কম।

প্রথমে মুখে গরম পানির ভাপ নিয়ে নিন। একটি ডিমের সাদা অংশ অনেকক্ষণ বিট করুন যেন একটা ফোমের মতো প্যাক তৈরি হয়। এটা মুখে অল্প অল্প করে লাগিয়ে নিন। ডিমকে আঠা হিসেবে ব্যবহার করে পুরো মুখে শুকনো টিস্যু পেপার বিছিয়ে দিন। এবার শুকাতে দিন। টিস্যু বেশি ভেজা হলে প্রয়োজনে আরেক লেয়ার টিস্যু লাগান মুখে। পুরোপুরি শুকিয়ে গেলে টিস্যু নিচ থেকে ওপর দিকে টেনে তুলুন। ভালোভাবে মুখ ধুয়ে বরফ ঘষে নিন।

এক মগ ফুটন্ত পানিতে দু’টি গ্রিন টিব্যাগ দিয়ে আধা ঘণ্টা রেখে দিন। তার পর ফ্রিজে দুই ঘণ্টা রেখে চা ঠাণ্ডা করে নিন। মৃদু কোনো ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে-মুছে নিন। তুলা দিয়ে ঠাণ্ডা গ্রিন টি ব্ল্যাকহেডসের ওপরে লাগান। যদি মুখে ব্রণ থাকে তাহলে সারা মুখে লাগান। ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। নরম কাপড় দিয়ে মুখ মুছে ময়েশ্চারাইজার লাগান। অন্তত ছয় সপ্তাহ একটানা প্রতিদিন কমপক্ষে একবার করে লাগাতে হবে। একদিনও বাদ দেয়া যাবে না। নিয়মিত গ্রিন টি খেলেও ব্রণ ও ব্ল্যাকহেডস কমে।

তিন টেবিল চামচ টকদই, দুই টেবিল চামচ আস্ত ওটস মিশিয়ে এক ঘণ্টা রেখে দিন। তার পর ভালোমতো মিশিয়ে একটি পেস্ট তৈরি করে নিন। সারা মুখে লাগান। শুকিয়ে গেলে কুসুম গরম পানিতে ধুয়ে ফেলুন। তার পর ঠাণ্ডা পানি দিয়ে আবারো মুখ ধুয়ে নিন।

ব্ল্যাকহেডস দূর করতে মেথি খুবই কার্যকরী একটি উপাদান হিসেবে প্রমাণিত। ১ টেবিল চামচ মেথি ৬ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রেখে তা দিয়ে পেস্ট তৈরি করে নিন। এই পেস্ট ব্ল্যাকহেডসের ওপর লাগিয়ে ১০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।

কী কী করবেন ও কী কী করবেন না

১. পানিতে দ্রবণীয় হালকা ধরনের ক্লিনজার ব্যবহার করবেন। ভেজা, নরম ও পরিষ্কার এক টুকরো কাপড়ে ক্লিনজার নিয়ে ধীরে ধীরে আলতোভাবে ত্বকের ওপরিভাগ পরিষ্কার করতে হবে, জোরে ঘষবেন না।।

২. প্রসাধনী ব্যবহারের ক্ষেত্রে জেল-বেসড ফর্মুলা বেছে নিন। জেল-বেসড ফর্মুলার লোশন বা ক্রিম পাওয়া না গেলে অন্তত হালকা ফর্মুলার ক্রিম বা লোশন ব্যবহার করুন। ভারী ফর্মুলার ক্রিম বা লোশন লোমকূপের মুখ বন্ধ করে ব্ল্যাকহেডসের জন্ম দেয়।

৩. প্রতিদিন স্যালিসাইলিক এসিডযুক্ত ক্লিনজার দিয়ে ত্বক পরিষ্কার করুন।

৪. ত্বক থেকে নিঃসৃত তেল বা সেবামের পরিমাণ কমাতে সপ্তাহে তিন দিন মুলতানি মাটির প্যাক ব্যবহার করতে পারেন।

৫. এমন একটি টোনার ব্যবহার করুন যাতে আছে ‘নিয়াসিনামাইড’। এটি ত্বকের লোমকূপ বা ‘পোর’-এর মুখ ছোট করতে সাহায্য করে। ফলে ব্ল্যাকহেডস কমে আসে।

৬. তৈলাক্ত ত্বকে ব্ল্যাকহেডস বেশি দেখা যায়। তাই যাদের ত্বক তৈলাক্ত, তাদের প্রতিদিন চার-পাঁচবার মুখ ধোয়া উচিত।

৭. অতিরিক্ত ঘষাঘষি বা স্ক্রাবিং করলে ত্বকের সেবাম উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, যা ব্ল্যাকহেডস আরো বাড়িয়ে তোলে। তাই অতিরিক্ত ঘষাঘষি বা স্ক্রাবিং করা যাবে না।

৮. খেয়াল রাখতে হবে যেন ব্ল্যাকহেডস বের করার জন্য কখনোই ত্বকে অতিরিক্ত জোরে চাপ দেয়া যাবে না, এতে ব্ল্যাকহেডসের আশেপাশের ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

৯. চেহারায় বারবার হাত দেবেন না। ময়লা হাত ত্বকে লাগালে জীবাণুর সংক্রমণ ঘটে, যার ফলে ব্রণ ও ব্ল্যাকহেডস বৃদ্ধি পায়।

আরএম-২১/১৭/০৯ (লাইফস্টাইল ডেস্ক)