নির্বাচনী প্রচারণায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্রাধান্য পাবে

প্রকাশিতঃ ডিসেম্বর ৫, ২০১৮ আপডেটঃ ৮:৫৫ অপরাহ্ন

বাংলাদেশে এবারের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায় ঐতিহ্যগত ধারার চেয়ে এগিয়ে আছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম৷ এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ওয়েবসাইটসহ আরো অনেক নতুন নতুন কৌশল৷

নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হবে প্রতীক বরাদ্দের পর৷ কিন্তু বাস্তবে অনলাইন এবং ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচারণা শুরু হয়ে গেছে আরো অনেক আগে৷ প্রার্থীদের দলীয় মনোনয়ন কেনার সময়ই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে শুরু হয়েছে কৌশলী প্রচারণা৷ দলীয় মনোনয়নপত্র কেনার পরই প্রার্থী বা তাঁদের সমর্থকরা তা ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগের নানা মাধ্যমে ‘পোস্ট’ করে তাঁদের মাঠে থাকার কথা জানান দিয়েছেন৷ এরপর দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর মনোনয়নের চিঠি হাতে পেয়ে আরেক দফা প্রচারণা চলেছে ফেসবুকে৷ যাঁরা দলের মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে পেরেছেন, তাঁদের কেউ কেউ ফেসবুক লাইভে এসে মনোনয়ন পাওয়ার কথা জানিয়ে দোয়াও চেয়েছেন৷

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবার নির্বাচনি প্রচারণায় দলগুলো বিজ্ঞাপনী সংস্থা, বিজ্ঞাপন নির্মাতা এবং ডিজিটাল মার্কেটিং যাঁরা করেন, তাঁরাও যুক্ত হচ্ছেন৷ বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচার ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ‘পোস্ট’ দেয়ার জন্য ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপ বানানো হচ্ছে৷ আছে আকর্ষণীয় ‘স্টিল’ বিজ্ঞাপনও৷ এসব বিজ্ঞাপনে সেলিব্রেটি ছাড়াও সাধারণ মানুষকে মডেল হিসেবে কাজে লাগানো হচ্ছে৷

ডিজিটাল নির্বাচনি প্রচারণায় এগিয়ে আছে আওয়ামী লীগ৷ প্রার্থীরা এখনো আলাদাভাবে তেমন প্রচার-প্রচারণা শুরু না করলেও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নানা ধরনের ‘ভিডিও ক্লিপ’ তৈরি করা হয়েছে৷ তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার সঙ্গে সঙ্গে আছে সব ধরনের ভোটারকে আকৃষ্ট করার নানা ‘ভিডিও ক্লিপ’ ও ‘টেমপ্লেট’৷ সেখানে মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন ও উন্নয়ন-ভাবনা চুম্বক আকারে তুলে ধরা হচ্ছে৷ এমনকি সাংবাদিকদের কাজের সুবিধার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১০টি বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে ১০টি বুকলেটের একটি সেটও তৈরি করা হয়েছে৷ এসব কাজে নিয়োজিত আছেন দক্ষ পেশাজীবীরা৷

এই যেমন, একটি প্রোডাকশন হাউজের পক্ষ থেকে কাজ করছেন নির্মাতা চয়নিকা চৌধুরী৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘আমরা একদম ‘মাস’ লেভেলে গিয়ে ছোট ছোট ডকুমেন্টরির কাজ করছি৷ পদ্মা সেতু নিয়ে একটি কাজ করেছি পদ্মা সেতু এলাকায় গিয়ে৷ সেখানকার সাধারণ মানুষই কথা বলেছেন৷ এটি সব প্রাইভেট টিভি চ্যানেলে প্রচার করা হবে নির্বাচনের আগে৷”

তাঁর কথায়, ‘‘এটা আমি প্রাণের তাগিদেই করছি৷ টাকা-পয়সা এখানে মূল কথা নয়৷ আরো অনেকগুলো কাজ করব নির্বাচনের আগে৷ গানের ভিডিও-ও করবো৷ সেগুলো ইউটিউবেও যাবে৷”

তিনি বলেন, ‘‘দেশটা যে ডিজিটাল প্রযুক্তির দিকে যাচ্ছে, তার সুবিধা সবাই নিতে পারেন৷ এবার নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণায় ডিজিটাল প্রযুক্তিই এগিয়ে থাকবে৷” তাই ‘ডিজিটাল মার্কেটিং’-এর সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, তাঁরাও সক্রিয় হয়েছেন নির্বাচনি প্রচারণায়৷

জেলায় আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রার্থীকে এই প্রচারণায় সহায়তা দিতে আলাদা আলাদা গ্রুপ তৈরি হচ্ছে৷ তাঁরা শুধু ফেসবুক বা ফেসবুক পেজ নয়, ওয়েবসাইট খুলেও নির্বাচনি প্রচারণার প্রস্তুতি নিচ্ছেন৷ এর সঙ্গে জড়িত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এবং ডিজিটাল মার্কেটার সুমন জাহিদ জানান, ‘‘এই গ্রুপগুলোতে ওয়েবপেজ ডেভেলপার, কন্টেন্ট প্রোভাইডার, সোশাল নেটওয়ার্ক এক্সপার্ট, ভিডিও এডিটর – সবই থাকছে৷ এরকম অনেকগুলো গ্রুপ এরইমধ্যে কাজ শুরু করেছে৷ এবার ডিজিটাল ক্যাম্পেইনের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে আওয়ামী লীগ৷”

তাঁর মতে, ‘‘এবার ফেসবুক ছাড়াও ইউটিউব, টুইটার ও ইন্সটাগ্রাম ব্যবহার হবে নির্বাচনি প্রচারণায়৷”

তিনি বলেন, ‘‘প্রচলিত ধারার মিছিল, মিটিং, শোভাযাত্রা, পোস্টার প্রচারপত্র তো থাকছেই৷ কিন্তু ডিজিটাল ও অনলাইন ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে একটা ‘ওয়েভ’ তৈরি করা হচ্ছে৷ সেখানে মূল ‘ফোকাস’ থাকবে উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর৷ তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে চমকপ্রদ সব ডিজিটাল প্রচার থাকবে৷”

তাঁর কথায়, ‘‘নির্বাচন কমিশনের নীতি মেনে পোস্টার ব্যানার ও বিলবোর্ডেও আধুনিকতা আসছে৷ এখন সব প্রিন্টই জিজিটাল প্রিন্ট৷”

উঠোন বৈঠকও নির্বাচনি প্রচারণার একটি কার্যকর কৌশল৷ কোনো বাড়ির আঙিনায় বা খোলা জায়গায় ওই এলাকার সীমিত সংখ্যক ভোটারের মধ্যে প্রচারণার কৌশল৷ এভাবেই নির্বাচনি প্রচারণা নিয়ে কাজ করছেন ঢাকা ইউনিভার্সিটি ফিল্ম সোসাইটির সাবেক সভাপতি মীর রেজওয়ান মাহমুদ তন্ময়৷ তিনি জানান, ‘‘উঠান বৈঠকে প্রার্থীরা সাধারণত যেতে পারেন না৷ এতে তাঁদের কর্মী-সমর্থকরা ‘ওয়ান টু ওয়ান’ কথা বলতে পারেন৷ প্রতিশ্রুতির কথা জানাতে পারেন৷ এটা বেশ কার্যকর হয়৷”

জানা গেছে, তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের যে তরুণ-তরুণীরা নতুন ভোটার হয়েছেন, তাঁদের নিজ নিজ এলাকায় গ্রুপ করে প্রচারণার কাজে লাগানো হবে৷ এঁদের ওরিয়েন্টেশনও চলছে৷ এই কাজে সহায়তার জন্য নির্বাচনের মনোনয়ন চেয়েও যেসব তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা মনোনয়ন পাননি, তাঁদের নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত করা হচ্ছে৷

মীর রেজওয়ান মাহমুদ তন্ময় বলেন, ‘‘এটা বেশ কাজে দেয়৷ তরুণরা তরুণদের আকৃষ্ট করতে পারে৷”

তিনি আরো বলেন, ‘‘স্থানীয় পর্যায়ে গান, উন্নয়ন সংবাদ, সামনে যা আসছে এসব নিয়ে অডিও প্রোডকশনও হচ্ছে৷”

ওদিকে বিএনপিও নির্বাচনি প্রচারের প্রস্তুতি নিচ্ছে৷ তবে এখন পর্যন্ত তারা একটু পিছিয়ে আছে বলেই সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে৷ সাবেক ছাত্র নেতা ও যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা রেজা পাহলভী মাসুম বিএনপির প্রচার-প্রস্তুতিতে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের একজন৷ তিনি জানান, ‘‘আমরা আন্দোলনে থাকায় নির্বাচনি প্রচারণার প্রস্তুতি নিতে একটু সময় নিচ্ছি৷ তবে আমরাও ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমকে নির্বাচনি প্রচারণায় গুরুত্ব দেবো৷ আমরা সেভাবেই কাজ করছি৷ আমাদের মূল ‘ফোকাস’ থাকবে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা৷”

এবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমান মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন লন্ডন থেকে, স্কাইপে৷ এরপর ফেসবুক লাইভে এসে তিনি নেতা-কর্মীদের নির্বাচনের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন৷ জানা গেছে, তারেক রহমান নির্বাচনে এই পদ্ধতি অব্যাহত রাখবেন৷ রেজা পাহলভী বলেন, ‘‘বিএনপির নেতা-কর্মীরা আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি থেকে কোনোভাবেই পিছিয়ে নেই৷”

এবার নির্বাচনি প্রচারণায় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এবং তথ্য প্রযুক্তিই প্রাধান্য বিস্তার করবে বলে মনে করেন কন্টেন্ট ম্যাটারস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী রফিকুল্লাহ রোমেল৷ তিনি বলেন, ‘‘আড়াই কোটির বেশি নতুন ভোটার৷ কেউ মনে করতে পারেন গ্রামের তরুণরা এখনো তথ্য-প্রযুক্তির আওতায় আসেননি৷ আসলে তা ঠিক নয়৷ তাঁদের মধ্যে প্রায় ৮০ ভাগ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন৷ মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন প্রায় সবাই৷”

তাঁর কথায়, ‘‘এখনও পর্যন্ত যেসব কন্টেন্ট সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, তা আমার কাছে খুব বেশি কার্যকর মনে হয় না৷ সংক্ষেপে বিভিন্ন দলের কাজের তুলনা করার মতো কন্টেন্ট কম৷ তবে নির্বাচনের আগে হয়ত আসবে৷ অনেকেই এ সব নিয়ে কাজ করছেন বলে আমি জানি৷”

মোবাইল, এসএমএস এবার নির্বাচনের প্রচারণায় বড় একটি জায়গা দখল করবে বলে মনে করা হচ্ছে৷ আর অল্প খরচে ‘বাল্ক এসএমএস’ দেয়ার জন্য অনেক প্রতিষ্ঠান আছে৷ ঢাকাসহ শহর এলাকায় ভোটারদের ফোন নাম্বার সরবরাহের প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে৷ টেলিফোন অপারেটররা সরাসরি সহায়তা করবেন না৷

নির্বাচনি প্রচারণায় দু’দলেই তারকারা অংশ নেবেন৷ অংশ নেবেন সেলিব্রেটিরা৷ এ জন্য দু’দলই এলাকাভিত্তিক টিম এবং ‘শিডিউল’ তৈরি করছে৷এবার নির্বাচনি ফ্যাশনও আসতে পারে৷ নৌকা মার্কার শাড়ি বা ধানের শীষের টি শার্ট-এর বিজ্ঞাপন এরই মধ্যে চোখে পড়ছে৷

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এরই মধ্যে ভুয়া নিউজেরও ছড়াছড়ি৷ এবার এই ভুয়া খবর নির্বাচনের একটি ‘বড় আপদ’ হিসেবে দেখা দিতে পারে৷

এসএইচ-১৯/০৫/১২ (হারুন উর রশীদ স্বপন, ডয়চে ভেলে)