জাতীয় পার্টি ‘আসল’ বিরোধী দল হওয়া নিয়ে যত প্রশ্ন

প্রকাশিতঃ জানুয়ারী ৬, ২০১৯ আপডেটঃ ২:৫৬ অপরাহ্ন

সরকারে থেকে বিরোধী দল নয়৷ এবার সত্যিকারের বিরোধী দল হতে চায় জাতীয় পার্টি৷ তারা দেশ ও জনগণের কল্যাণে ভূমিকা রাখতে চায় বলেই এই সিদ্ধান্ত৷ কিন্তু এটা বাস্তবে কতটা সম্ভব হবে?

নির্বাচনের পর জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা প্রকাশ্যেই দশম সংসদের মতো একাদশ সংসদেও সরকারে থেকেই বিরোধী দলে থাকার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন৷ জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বও এজন্য প্রধানমন্ত্রীর ‘সিগন্যালের’ অপেক্ষায় ছিলেন৷ জাতীয় পার্টি লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের অধীনেই নির্বাচন করে৷ লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে মোট ২২ জন নির্বাচিত হয়েছেন৷

জানা গেছে, শুক্রবার রাতে দলের চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ এবার সত্যিকার অর্থেই সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন৷ তিনি হবেন বিরোধী দলীয় নেতা৷ জিএম কাদেরকে উপনেতা আর মশিউর রহমান রাঙ্গাকে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি৷ আর সেই অনুযায়ী শনিবার সংবাদ মাধ্যমে বিবৃতিও পাঠানো হয়েছে৷

প্রসঙ্গত, গত সংসদেও জাতীয় পার্টি বিরোধী দলে ছিল৷ কিন্তু, তাদের দল থেকে আবার তিনজন মন্ত্রীও ছিলেন সরকারে৷ তাঁরা হলেন পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, শ্রমপ্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা৷ আর এরশাদ মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন৷

জাতীয় পার্টির মধ্যে বিভক্তি

সোমবার নতুন মন্ত্রিসভার শপথ নেয়ার কথা রয়েছে৷ শেষ পর্যন্ত যদি এরশাদ তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন তাহলে মন্ত্রিসভায় জাতীয় পার্টির কোনো মুখ দেখা যাবেনা৷ গত সংসদে এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ বিরোধী দলীয় নেতা হলেও এবার তাঁর কী অবস্থান হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়৷ তবে, জাতীয় পার্টির মধ্যে এখনো বিভক্তি স্পষ্ট৷

একাধিক সূত্র জানায়, একটি অংশ এখনো চায় সরকারে থেকেই বিরোধী দল হতে৷ তাদের যুক্তি হল ‘প্রকৃত’ বিরোধী দল হলে তারা অনেক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন৷ ২০০৮ সালের নির্বাচনেও জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের অংশ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়৷ ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি সরকারে অংশ নেয়৷ মন্ত্রিত্ব নেয়৷ বিএনপি ছিল বিরোধী দলে৷ ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর তারা সরকারে অংশ নিয়েও বিরোধী দল হওয়ার এক নতুন ‘দৃষ্টান্ত’ স্থাপন করে৷

জাতীয় পার্টির মহাসচিব এখন মশিউর রহমান রাঙ্গা৷ নির্বাচনের আগে রুহুল আমীন হাওলাদারকে এই পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়৷ কিন্তু এরশাদের অনুপস্থিতে দলের সব সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের হাতে৷ তিনি এরশাদের ছোট ভাই৷ তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর মহাজোট সরকারের মন্ত্রীও ছিলেন৷ এবার তাঁকে এরশাদ বিরোধী দলীয় উপনেতার পদ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন৷

জিএম কাদের বলেন, ‘‘নির্বচনে আমাদের মহাজোটের প্রতিপক্ষ ছিল ঐক্যফ্রন্ট এবং বিএনপি’র নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট৷ তারা যে নির্বাচনে এত খারাপ করবে তাতো আমরা আগে বুঝতে পারিনি৷ এখন দেখা যাচ্ছে সংসদ একতরফা হয়ে যাচ্ছে৷ বিরোধী দল বলতে তেমন কিছু থাকছে না৷ এটা মহাজোটও চিন্তা করছে৷”

তিনি বলেন, ‘‘আমরা আলাদা লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছি৷ সংসদে জনগণের কথা বলা দরকার৷ তাদের অভাব অভিযোগের কথা তুলে ধরা দরকার৷ আমাদের সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতাও আছে৷ তাই আমরা বিরোধী দলে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছি৷ আমাদের দল থেকে কেউ মন্ত্রিত্ব নেবেনা৷ এটা আমাদের নেতার, দলের চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত৷”

তিনি আরো বলেন, ‘‘আমাদের আশা, এবার আমরা সত্যিকারের কার্যকর বিরোধী দলে পরিণত হতে পারব৷”

গত সংসদে সরকারে ও বিরোধী দলে একই সঙ্গে থাকায় কী সমস্যা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আমরা সেখানে আমাদের প্রতি জনগণের আস্থার সংকট লক্ষ্য করেছি৷ এর কারণ হলো আমাদের বেশ কিছু সদস্য সরকারের মন্ত্রিসভায় ছিলেন৷ সেখানে আমরা যে সব সময় সরকারের সমালোচনা ঠিকমত করেছি কিনা, আমরা সকারের পক্ষপাত্বি করছি কিনা- এটা নিয়ে সাধারণ মানুষের সন্দেহ ছিল৷”

এবার জাতীয় পার্টি থেকে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন ২২ জন৷ জানা গেছে, তাদের একটি অংশ এরশাদের স্ত্রী এবং জাতীয় পার্টির সিনিয়র কো-চেয়াম্যান রওশন এরশাদের অনুসারী৷ দলের এই অংশটি এখনো চায় সরকারে অংশ নিয়েই বিরোধী দল হতে৷ তারা এখনো দৌড়ঝাঁপ অব্যাহত রেখেছেন৷

কার্যকর বিরোধী দল কি হতে পারবে জাতীয় পার্টি?

প্রশ্ন হচ্ছে যদি জাতীয় পার্টি সরকারে না থেকে বিরোধী দলের আসনে বসে তারপরও তারা সংসদে কার্যকর বিরোধিতা গড়ে তুলতে পারবে কিনা৷ কারণ তারা মহাজোটের অংশ এবং গত সংসদে তাদের বিরোধিতার কোনো ইচ্ছাও দেখা যায়নি৷ এর জবাবে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘‘গত সংসদের বিরোধী দল ছিল অদ্ভূত৷ তারা সরকারেও ছিল আবার বিরোধী দলেও ছিল৷ এটা ছিল নজিরবিহীন ও অভিনব৷ তবে এবার যে তারা সরকারে না থেকে বিরোধী দলে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এটাকে আমি ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি৷”

তিনি বলেন, ‘‘এখন তারা সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করতে পারবে৷ বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র হয়না৷ আগের সংসদে যা ছিল তাকে বিরোধী দল বলা যায়না৷”

তবে শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টি সরকারে না থেকে সত্যিই বিরোধী দলে বসছে কিনা তা নিয়ে এখনো সন্দেহ সংশয় আছে৷ কারণ মন্ত্রিসভা গঠন হতে এখনো ২৪ থেকে ৩৬ ঘন্টা সময় আছে৷ সরকারে যেতে আগ্রহীদের শেষ পর্যন্ত কি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে?

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় পার্টি এবার সত্যিকারের বিরোধী দলে বসুক এটা সরকারও চায়৷ এই নিয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এরশাদ সাহেবের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত৷ তাই কারুর সরকারের মন্ত্রিসভায় যাওয়ার সুযোগ নেই৷ এটা নিয়ে দলে কোনো দ্বিমত নেই৷ এবার আমরা বিরোধী দলেই বসছি৷ আর রওশন এরশাদ এবার বিরোধী দলীয় নেতা হতে চাননি বা বিরোধী দলের কোনো পদে থাকতে চাননি৷ তাই তাঁর নাম আসছে না৷”

ঐক্যফ্রন্টে জটিলতা

এদিকে, এবার বিএনপি’র প্রাধান্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে ৭ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন৷ ৫ জন বিএনপি এবং ঐক্যফ্যন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেনের দল গণফোরাম থেকে ২ জন৷ ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র এবং বিএনপি’র মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচনের পর স্পষ্ট করেই জানিয়েছিলেন, ঐক্যফ্রন্টের ৭ জনের কেউই সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন না৷

কিন্তু শনিবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণফোরাম থেকে যে দু’জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তারা সংসদে যাবেন৷ তাঁরা অনেক প্রতিযোগিতা করে নির্বাচিত হয়েছেন৷ গণফোরামের পক্ষ থেকে আমরা তাদের অভিনন্দন জানিয়েছি৷”

এসএইচ-১২/০৬/১৯ (হারুন উর রশীদ স্বপন, ডয়চে ভেলে)