পুলিশের কিছু পদক জয় নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশিতঃ ফেব্রুয়ারী ৮, ২০১৯ আপডেটঃ ১:০৪ অপরাহ্ন

প্রতিবছরই পেশাগত দক্ষতা ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য পুলিশ সদস্যদের পদক দেয়া হয়৷ পুলিশ সপ্তাহে এই পদক বিতরণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী৷ এবার পদক পেয়েছেন মোট ৩৪৯ জন৷ তবে কয়েকটি পদক জয়ের কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে৷

অপরাধ দমন, মাদক নিয়ন্ত্রণ, আসামি গ্রেপ্তার, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বা জীবন বিপন্ন করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করা পুলিশ সদস্যদের পদক পাওয়ার প্রচলিত মাপকাঠি৷ তবে এবার কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি কৃতিত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে৷ এমনকি কোটা সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান এবং খ্যাতিমান আলোকচিত্রী ড. শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তারের বিষয়টিও কৃতিত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এর জন্য পদক দেয়া হয়েছে৷

পুলিশে সাহসিকতা ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য চার ধরনের পদক বা পুরস্কার চালু আছে৷ এগুলো হলো: বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম), বাংলাদেশ পুলিশ পদক বিপিএম (সেবা), রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (পিপিএম) ও রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (সেবা)৷ পদকের সঙ্গে বিপিএম-এর জন্য সম্মানী হিসেবে এককালীন এক লাখ টাকা এবং মাসিক দেড় হাজার টাকা, বিপিএম সেবার জন্য এককালীন ৭৫ হাজার টাকা এবং মাসিক দেড় হাজার টাকা, পিপিএম-এর জন্য এককালীন ৭৫ হাজার টাকা ও প্রতি মাসে এক হাজার টাকা এবং পিপিএম-সেবা পদকের জন্য এককালীন ৫০ হাজার টাকা ও মাসিক এক হাজার টাকা পান পদক প্রাপ্তরা৷ অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এবারই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পুলিশ সদস্য এই চার ক্যাটাগরিতে পদক পেয়েছেন৷ সাধারণত দুই ক্যাটাগরির সেবা পদক পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তাদের তাঁদের কাজের জন্য দেয়া হয়৷

ঢাকা মহানগর পুলিশ ( ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া এবার বাংলাদেশ পুলিশ পদক পেয়েছেন৷ ১০ ধরনের কৃত্বিপূর্ণ অবদানের জন্য তাঁকে এই সর্বোচ্চ পুলিশ পদক দেয়া হয়েছে৷ অবদানগুলোর মধ্যে দু’টি হলো: ‘নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন’ চৌকষ ও বুদ্ধিদীপ্ত পন্থায় সুষ্ঠুভাবে নিয়ন্ত্রণ ও চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ৷

নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল ছাত্রদের আন্দোলন ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের ব্যাপারে আগাম গোয়েন্দা তথ্য দেয়ার জন্য পদক পেয়েছেন পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মীর শহীদুল ইসলাম৷

একই কৃত্বিপুর্ণ কাজের জন্য পদক পেয়েছেন এসবির উপ-মহাপরিদর্শক মাহবুব হোসেন, বিশেষ পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান, এসবির পুলিশ পরিদর্শক এ কে এম সাহাবুদ্দীন শাহীন এবং উপ-পরিদর্শক মো. মহিউদ্দীন৷

বলা হয়েছে, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক জোট পুঁজি করে নাশকতার চেষ্টা করেছে৷ তাঁরা তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে কুচক্রী মহল শনাক্ত করেন৷ তাঁরা আগাম জানতে পারেন ষড়যন্ত্র করে নিরাপদ সড়ক ও কোটা সংস্কার আন্দোলনকে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ দিতে পারে৷

একই ধরনের কৃতিত্বের জন্য পদক পেয়েছেন গোয়েন্দা বিভাগের সিনিয়র সহকারি পুলিশ কমিশনার মো. শাহাদত হোসেন সুমা ও ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ নূরুল আমীন৷

খ্যাতিমান আলোকচিত্রী ড. শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তার করাকে কৃতিত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে৷ গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার কাজী শফিকুল আলম মোট আটটি কৃতিত্বপূর্ণ কাজের জন্য পুরস্কার পেয়েছেন৷ তার মধ্যে ড. শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তার করা একটি৷

কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা রাশেদ খানকে গ্রেপ্তার করে পদক পেয়েছেন গোয়েন্দা বিভাগের উপ-কমিশনার মো. আশিকুর রহমান৷ তাঁর সাত কৃতিত্বের মধ্যে রাশেদকে গ্রেপ্তার একটি অন্যতম কৃতিত্ব৷ রাশেদকে বলা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টির মদদদাতা৷

মানবাধিকার কর্মী এবং সাবেক তত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, ‘‘নিশ্চয়ই অনেক পুলিশ সদস্য দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় তাঁদের কৃত্বিপূর্ণ অবদানের জন্য পুরস্কার পেয়েছেন৷ তাঁদের অভিনন্দন জানাই৷ কিন্তু এরসঙ্গে আরো কিছু কৃতিত্বের কথা বলে যে পুরস্কার দেয়া হয়েছে, তা শুনে আমি অবাকই হয়েছি৷

নিরাপদ সড়ক জনগণের অত্যন্ত একটা গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল৷ সেই আন্দোলন দমন করার জন্য কেন পুলিশ পুরস্কৃত হবেন? কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল৷ শহিদুল আলম একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তি৷ তাঁকে যে কারণে গ্রেপ্তারের কথা বলা হচ্ছে, তা এখনো প্রমাণ করা যায়নি৷ এসব কাজের জন্য যদি পুরস্কৃত করা হয়, তাহলে তো বলতেই হবে, তাদের জনস্বার্থবিরোধী কাজের জন্য পুরস্কৃত করা হয়েছে৷’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘এটা রাষ্ট্রীয় পুরস্কার৷ জনগণের অর্থে এই পুরস্কার দেয়া হয়৷ কিন্তু জনগণের অর্থে যদি জনবিরোধী কাজের জন্য পুরস্কার দেয়া হয়, সেটা তো আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক৷ এর মাধ্যমে পুরস্কারকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে৷ পুরস্কারের মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করা হচ্ছে৷’’

পুলিশের সাবেক আইজি মোহাম্মদ নূরুল হুদা বলেন, ‘‘পুলিশের প্রধানত দু’টি কাজ৷ একটা হলো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা বা অর্ডার ফাংশন৷ আর আরেকটি হলো ক্রাইম ফাংশন৷ দু’টোই জরুরি৷ অর্ডারটা ঠিক থাকলে ক্রাইম কমে৷ এখন কথা হলো, সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা, খারাপ পরিস্থিতি যাতে সৃষ্টি না হয় সেটার ব্যবস্থা করা পুলিশের একটা কাজ৷ যদি সরকার মনে করে অর্ডার ঠিক রাখা হয়েছে, শান্তি-শৃঙ্খলা ঠিক রাখা হয়েছে, তাহলে সেটাকে সরকার একটা অর্জন বা অ্যাচিভমেন্ট হিসেবে বিবেচনা করতেই পারে৷’’

এসএইচ-০৫/০৮/১৯ (হারুন উর রশীদ স্বপন, ডয়চে ভেলে)