ছাত্রলীগ নেতাদের ‘ভিআইপি’ প্রটোকল!

প্রকাশিতঃ সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯ আপডেটঃ ৩:৫৬ অপরাহ্ন

ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক চলেন ‘ভিআইপি’ প্রটোকলে৷ তারা যেখানে যান সেখানেই কর্মী ও সাধারাণ শিক্ষার্থীদের প্রটোকল দিতে হয়৷ আর তারা বিকেল তিনটার আগে ঘুম থেকে ওঠেন না৷

এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও তাদের জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতে হয়৷এর বাইরে আর্থিক লেনদেনসহ আরো অনেক অভিযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধে৷ এ নিয়ে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিবেদনও দিয়েছে৷ আর এই সব অভিযোগ নিয়ে স্বয়ং আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষুব্ধ৷

ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী

শনিবার রাতে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার ও সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের যৌথসভায় প্রধানমন্ত্রী নিজেই অভিযোগের কথা তোলেন৷ সেখানে উপাস্থিত আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারাও তার সঙ্গে একমত হন৷ বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন,‘‘ছাত্রলীগের নানা অনৈতিক কাজের অভিযোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বৈঠকে ৷ তিনি নিজেই প্রথমে নেতাদের সামনে অভিযোগের কথা তোলেন৷

তিনি প্রায় ১০-১৫ মিনিট ছাত্রলীগ নিয়ে কথা বলেন৷ প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হয়ে ওই বৈঠকে ছাত্রলীগের কমিটি ভেঙে দেয়ার কথাও বলেন৷ তবে তিনি সেটা মিন করে বলেছেন কিনা সেটা আমি বলতে পারবনা৷ তিনি এ নিয়ে নেতাদের দায়িত্ব দিয়েছেন৷ অভিযোগগুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন তারা৷ তারাই এখন বিষয়টি দেখছেন৷”

‘ভিআইপি’প্রটোকল ও বিকেলে ঘুম থেকে ওঠা

শনিবার প্রধানমন্ত্রীর এই ক্ষোভের পরও রবিবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলে চারটি গণরুমে তালা লাগিয়ে দেয়া হয়৷ কারণ ওই রুমের শিক্ষার্থীরা রোববার মধুর ক্যান্টিনে প্রটোকল দিতে যায়নি৷ প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভের কথা জেনে রোববার দুপুরে মধুর ক্যান্টিনে যান ছাত্র লীগের সভাপতি সাধারণ সম্পাদক৷

ওই গণরুমের বাসিন্দা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র জোনায়েদ হেসেন জানান,‘‘মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক গেলে তাদের অনুসারী হল নেতারা দলবল নিয়ে তাদের গিয়ে প্রটোকল দেয়৷ আর সেজন্য তারা হল থেকে সাধারণ ছাত্রদের নিয়ে যায়৷ কিন্তু ওই দিন সূর্যসেন হলের চারটি গণরুমের ছাত্ররা প্রটোকল দেয়নি৷ তাই রাতে ছাত্রলীগ নেতারা ওই চারটি রুমে তালা মেরে দেয়৷”

ছাত্রলীগের পদবঞ্চিতদের মুখপাত্র এবং আগের কমিটির কর্মসূচি ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক রাকিব হোসেন জানান,‘‘ছাত্রলীগের সভাপতি আর সাধারণ সম্পাদককে চলাফেরার সময়ও মটরবাইক যোগে প্রটোকল দিতে হয়৷ তারা যে রাস্তা দিয়ে চলাফেরা করেন সেখানে এই প্রটোকলের কারণে তীব্র যানজট তৈরি হয়৷”

তিনি আরো জানান,‘‘তারা কেউই বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকেন না৷ বাসায় থাকেন৷ সেখানেই তাদের অনুসারীরা হাজিরা দেন৷ তারা সাধারণত দুপরের পর ঘুম থেকে ওঠেন৷ আর যদি কখনো ক্যাম্পাসে আসেন তা বিকেল তিনটার পর৷” প্রধানমন্ত্রী নিজেও শনিবারের বৈঠকে তাদের বিকেলে ঘুম থেকে ওঠার কথা বলেছেন৷ অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভের পর তারা এখন নিয়মিত সকাল সকাল ক্যাম্পাসে আসা শুরু করেছেন বলে জানান রাকিব৷

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ছাত্রলীগ সভাপতিকে প্রটোকল দিতে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে ঢুকে পড়েন শত শত নেতা-কর্মী৷ তারা নিরাপত্তা বেষ্টনি উপেক্ষা করে টার্মাকে চলে যান, বিমানের দরজার কাছে গিয়েও ভীড় করেন৷

প্রধান পাঁচ অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সাথে কথা বলে ও গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে পাঁচ কারণে প্রধানমন্ত্রী তাদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন৷

১.বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নির্ধারিত সময়ে না থাকা৷ গত ২০ জুলাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগেরই একটি অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যান নির্ধারিত সময় সকাল ১১টায়৷ ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যান বিকেল তিনটায়৷

২.জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ইডেন মহিলা কলেজের সম্মেলন হওয়ার পর দেড় মাস চলে গেলেও কমিটি গঠন না করা৷

৩. নিয়ম বহির্ভূতভাবে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি করা ৷

৪. ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয় সম্মেলনের এক বছর পর ১৩ মে৷ তবে সম্মেলনের আড়াই মাস পর রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও গোলাম রাব্বানীকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করা হয়৷ কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের পরই তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক দেখা দেয়৷ পরে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে কমিটি থেকে বিতর্কিত ১৯ জনকে বাদ দেয়ার ঘোষণা দিয়েও বাস্তবে বাদ না দেয়া৷

৫. আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ৷

অভিযোগ আছে কেন্দ্রীয় কমিটিতে অর্থের বিনিময়ে পদ দেয়া হয়৷ জেলা কমিটিকে না জানিয়ে সরাসরি অর্থের বিনিময়ে সাতটি উপজেলা কমিটি গঠন৷ নারায়ণগঞ্জ এবং কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলা কমিটিতে অর্থের বিনিময়ে নিজস্ব লোক ঢুকানো৷ আর্থিক সমঝোতা না হওয়ায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ইডেন কলেজের কমিটি গঠনে দেরি করা৷

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেখা যায় কেন্দ্রীয় কমিটিতে যাদের ঠাঁই দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে ৩৭ জনের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ আছে৷ এই অভিযোগগুলো হলো বিবাহিত, বহু বিবাহ, অছাত্র, মাদক ব্যবসায়ী, মাদকাসক্ত, জামায়াত ও শিবিরের সাথে যুক্ত, শিক্ষকের ওপর হামলাকারী প্রভৃতি৷ এই সব অভিযোগে অভিযুক্তদের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ঠাঁই দেয়ার পিছনে আর্থিক লেনদেন আছে বলে ধারণা করা হয়৷

শনিবার প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভের খবর পেয়ে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ওই রাতেই প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে গিয়ে বিমুখ হয়ে ফিরে আসেন৷ এখন পর্যন্ত তারা প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে পারেননি৷ তবে ছাত্রলীগের সাধারণ গোলাম রাব্বানী বলেন,‘‘এরপর দু’টি অনুষ্ঠানে আমাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দেখা হয়েছে৷ আমরা তার সঙ্গে আলাদাভাবে দেখা করার সময় চেয়েছি৷আমাদের কমিটি প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের কমিটি৷ তাই আমাদের প্রতি তার প্রত্যাশাও অনেক৷ আমাদের কোনো ভুল ভ্রান্তির কারণে তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন৷ তার এই ক্ষোভ স্বাভাবিক৷ আমরা আমাদের ভুল ত্রুটি কাটিয়ে আমাদের আপা প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করব৷

আর প্রধানমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে কী বলেছেন তাতো বাইরের কারুর জানার কথা নয়৷”

তিনি অন্যান্য অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন,‘‘কমিটিতে অর্থের বিনিময়ে পদ দেয়ার অভিযোগ পুরোপুরি মিথ্যা৷ কারুর অভিযোগ থাকলে প্রমাণ করুক৷ আর এবার মাত্র আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে হাজির হতে একটু দেরি করেছি৷ সেটা ছিলো ২০ জুলাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কউন্সিল অনুষ্ঠান৷ তার আগের দিন আমার মায়ের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী ছিলো ফরিদপুরে৷ পরদিন আমি ফিরেছি৷ সে কারণে দেরি হয়েছে৷ যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পিএসকে আগেই আমরা জানিয়েছিলাম৷ আর কোথাও আমরা দেরি করিনি৷”

ভিআইপি প্রটোকল সম্পর্কে তিনি বলেন,‘‘এটা আমরা নিষেধ করেছি৷ তারপরও যদি সবাই ভিড় করেন তাহলে আমাদের কী করার আছে৷ পুলিশ দিয়ে লাঠিচার্জ ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছি না৷ আর সূর্যসেন হলের ঘটনা একটি ভুল বোঝাবুঝি ছাড়া আর কিছুই না৷ আর সেটার সমাধান আমিই করেছি৷ যেখানে আমার প্রশংসা হওয়া উচিত সেখানে আমার বিরুদ্ধে সংবাদ মাধ্যমে রিপোর্ট হচ্ছে৷”

তিনি দাবি করেন,‘‘গণমাধ্যমে ছাত্রলীগ তথ্য সন্ত্রাসের শিকার, বিমাতা সুলভ আচরণের শিকার৷” সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের বক্তব্য জানার অনেক চেষ্টা করেও জানা যায়নি৷

এসএইচ-০৮/১০/১৯ (হারুন উর রশীদ স্বপন, ডয়চে ভেলে)