বেসিক ব্যাংকের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা কোথায়?

প্রকাশিতঃ অক্টোবর ১৭, ২০১৯ আপডেটঃ ২:৫২ অপরাহ্ন

শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু চেয়ারম্যান থাকাকালেই বেসিক ব্যাংকের প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে৷ প্রায় আট বছর ধরে এই ঘটনা তদন্ত করছে দুদক৷ কিন্তু তার বিরুদ্ধে এখনো অপরাধের কোনো প্রমাণ পায়নি তারা৷

ঢাকার ধানমন্ডি এলাকার আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস সম্প্রতি বাচ্চু প্রশ্নে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের পদত্যাগ দাবি করেছেন৷ তিনি সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির মূল ব্যক্তি ব্যাংকটির তখনকার চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বাচ্চু৷ সে কারণে তাকে ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণও করা হয়েছে৷ কিন্তু তার বিরুদ্ধে দুদক কোনো মামলা করেনি, এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থাও নেয়নি৷ তিনি বলেন, ‘‘দুদক চেয়ারম্যান যদি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন তাহলে তার পদত্যাগ করা উচিত৷’’

এর জবাবে দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার মঙ্গলবার বলেছেন, ‘‘দুদক তদন্তে এখনও বাচ্চুর বিরুদ্ধে ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ পায়নি৷’’

এনিয়ে দুদকের সচিবসহ কোনো কর্মকর্তার বক্তব্য বুধবার পাওয়া যায়নি৷ তবে বেসিক ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারি মামলায় দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘‘বাচ্চুর বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত তদন্তে ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া না গেলেও তদন্ত এখনও শেষ হয়নি৷ আমরা বলছি না যে তিনি জড়িত নন৷ তিনি জড়িত কী জড়িত না, তা তদন্ত পুরোপুরি শেষ না হলে বলা যাবে না৷ আমরা কোনো মামলারই চার্জাশিট দেইনি৷’’

তিনি বলেন, ‘‘বেসিক ব্যাংকের অনেকগুলো মামলা এবং মামলাগুলো খাত ওয়ারি৷ তদন্তের এই পর্যায়ে আমরা আরো ছয়-সাতটি মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছি৷’’

২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে বেসিক ব্যাংকের গুলশান, দিলকুশা ও শান্তিনগর শাখা থেকে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ঋণের নামে লোপাটের ঘটনা ঘটে৷ চার বছর অনুসন্ধানের পর দুদক ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংকের ২৬ জন কর্মকর্তাসহ ১৫৬ জনের বিরুদ্ধে ৫৬টি মামলা করে৷ কিন্তু ওই সময়ে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু বা পরিচালনা পর্ষদের অন্য কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করেনি দুদক৷ বাচ্চুকে ২০০৯ সালে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয় সরকার৷ ঋণ কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠলে ২০১৪ সালে চাপের মুখে পদত্যাগ করেন বাচ্চু৷

দুদক তাকে মামলার আসামি না করায় তখন ব্যাপক সমালোচনা হয়৷ এরপর উচ্চ আদালতের নির্দেশে ২০১৮ সালে তাকে দুদকে তলব করে কয়েকদফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়৷

দুদক বাচ্চুর কোনো সংশ্লিষ্টতা না পেলেও ২০১৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সংসদে তখনকার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছিলেন, ‘‘বাংলাদেশ ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংক কর্তৃক নিয়োগকৃত বহিঃনিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানদ্বয়ের দাখিলকৃত কার্যভিত্তিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অনিয়মিত ঋণ মঞ্জুর, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে উল্লেখ রয়েছে৷’

সাবেক অডিটর এন্ড কম্পট্রোলার জেনারেল এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, ‘‘বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারিতে যে সাবেক চেয়ারম্যান বাচ্চু জড়িত সেটা প্রমাণিত৷ এখন দুদক কেন প্রমাণ পায় না সেটাই বড় প্রশ্ন৷ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিববেদনে তার জড়িত থাকার কথা বলা হয়েছে৷ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে৷’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘আমি ব্যাক্তিগতভাবেও ওই সময় ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছি৷ তারা আমাকে বলেছেন, বাচ্চু সাহেব অনেককে ঋণ দিতে বাধ্য করেছেন যাদের ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা নেই৷ এমনকি এমন লোককে ঋণ দিতে বলেছেন যার ওই ব্যাংকে তখন একাউন্টই ছিল না৷’’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘‘দুদকের এই তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠছে৷ বাংলাদেশ ব্যাংক, নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং সংসদীয় কমিটির তদন্তে তার (বাচ্চু) জড়িত থাকার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু দুদক প্রমাণ পাচ্ছে না৷ দুদকের উচিত দেশের মানুষের কাছে তাদের অবস্থান পরিস্কার করা৷’’

তিনি বলেন, ‘‘দুদক স্ববিরোধী কথাও বলছে৷ তারা দাবি করেছে এরমধ্যে পাচার হওয়া দুই হাজার কোটি টাকা তারা উদ্ধার করেছে৷ কিন্তু কোথায় পাচার হয়েছিল তা তারা বলতে পারছে না৷’’

এসএইচ-০৪/১৭/১৯ (হারুন উর রশীদ স্বপন, ডয়চে ভেলে)