লকডাউন : বিপাকের মুখে নিম্ন আয়ের মানুষ

প্রকাশিতঃ মার্চ ২৩, ২০২০ আপডেটঃ ২:০৫ অপরাহ্ন

বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি এখন বিপদজনকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর্যায়ে রয়েছে বলে মনে করেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা৷ সেক্ষেত্রে শুধু ঢাকা নয় পুরো দেশকেই লকডাউন করার প্রয়োজন হতে পারে৷

গাইবান্ধার সদিল্লাপুর উপজেলাকে লকডাউন বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে রোববার৷ সম্প্রতি দেশে আসা দুই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সেখানে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নেন৷ তারই প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত এসেছে৷ এর আগে মাদারীপুরের শিবচর এবং ঢাকার টোলারবাগ এলাকাও অবরুদ্ধ করা হয়৷ পরিস্থিতির কারণে ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জের গার্মেন্টস পল্লীর পোশাক কারখানা রোবববার বিকেলে বন্ধের ঘোষণা দেয়া হয়েছে৷

রোববার বাংলাদেশে নতুন তিনজন করোনা সংক্রমিত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন৷ মোট রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ জনে৷ সিলেটে পর্যবেক্ষণে থাকা এক নারীর মৃত্যু হয়েছে৷ পরীক্ষা করানো হলেও তিনি করোনা সংক্রমিত কিনা এখনও তা জানা যায়নি৷

এমন পরিস্থিতিতকে বাংলাদেশ করোনা মহামারির তৃতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করছে৷ প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীর বলেন, ‘‘এটাকে বলা হয় ‘সুপার স্প্রিডিং’ বা বিপদজনকভাবে ছড়ানোর পর্যায়৷ পঞ্চম সপ্তাহ পর্যন্ত মহামারির বিস্ফোরণ ঘটার আশঙ্কা থাকে৷’’

এরিমধ্যে ঢাকা মিরপুরে একজনের মৃত্যু হয়েছে৷ তিনি বিদেশ ফেরত কারো সংস্পর্শে আসেননি বলেই জানা যাচ্ছে৷ লেলিন চৌধুরী মনে করেন, এতে প্রমাণ হয় বাংলাদেশে এখন করোনা কমিউনিটি স্প্রিডিং (স্থানীয়দের মাধ্যমে সংক্রমণ) পর্যায়ে চলে গেছে৷

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন যদি তাই হয়, তাহলে ঢাকাসহ আরো অনেক এলাকাকেই অবরুদ্ধ করে ফেলতে হবে৷ এই পর্যায়ে এমনিতেই ঢাকাসহ শহরগুলোতে যানবাহন চলাচল কমে গেছে৷ তৈরি পোশাক কারখানার রপ্তানি কার্যাদেশ বাতিল হচ্ছে প্রতিদিন, কমছে উৎপাদন৷ কাজ কমে যাচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের৷ এমনকি অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গত মাসের বেতন এখনো দেয়া হয়নি৷ অন্যদিকে শহর বা দেশ অবরুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলে প্রায় সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যাবে৷ এই পরিস্থিতি নিম্নবিত্ত মানুষ কিভাবে দিনযাপন করবেন?

ঢাকার কলাবাগানে রিকশা চালক আতাহার মিয়া শুক্রবার বিকেলে অলস সময় কাটাচ্ছিলেন৷ আগে দিনে যেখানে ছয়-সাতশ টাকা রোজগার করতেন এখন তা তিন-চারশ টাকায় নেমে গেছে বলে জানান তিনি৷ বলেন, ‘‘যদি সব কিছু বন্ধ হয়ে যায় কী খাবো , সংসার কিভাবে চালাব ভাবতে পারছি না৷ কোনো জমানো টাকাও নেই যে তা দিয়ে চলব৷ আল্লাহর উপর সব ছেড়ে দিয়েছি৷’’

একই অবস্থা দুধ বিক্রেতা আব্দুস সালামের৷ তিনি বাসায় মাস ভিত্তিতে দুধ বিক্রি করেন৷ তিনি বলেন, ‘‘এখন অনেকেই আর দুধ নেন না৷ বিক্রি অর্ধেকের নিচে নেমে গেছে৷ কেউ কেউ বাসায়ই যাওয়া নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন৷ বলেছেন একমাস পর যোগাযোগ করতে৷’’

কমে গেছে চা দোকানি জামাল হোসেনের বিক্রিও৷ সন্ধ্যার আগেই তাই দোকান বন্ধ করে দেন তিনি৷ তার আশংকা, ‘‘আর কয়েকদিন পর মনে হয় দোকান বন্ধই করে দিতে হবে৷ কিছু জমানো টাকা আছে তা দিয়ে আর কয়দিন চলবে?’’

ঢাকাসহ সারাদেশে পরিবহণ খাতে যারা বাস মিনিবাসের ড্রাইভার, সুপারভাইজার বা হেলপার হিসেবে কাজ করেন তারা মজুরি পান প্রতিদিনের ট্রিপ বা যাতায়তের ওপর৷ যাত্রী ও যাতায়াত দুটিই কমে যাওয়ায় তাদের আয় অনেক কমে গেছে৷ পরিবহণ বন্ধ হয়ে গেলে মালিকরা তাদের কোনো মজুরি দেবে কিনা এখনও কিছু জানায়নি৷ অটোরিকশা ও রাইডশেয়ারিং-এ যারা কাজ করেন তাদের অবস্থাও নাজুক৷ যারা দিন মজুরের কাজ করেন তাদের হাতেও এখন তেমন কাজ নেই৷

পোশাক কারখানায় ৪০ লাখ কর্মী কাজ করেন৷ সেই খাতটিই রয়েছে সবচেয়ে বড় সংকটে৷ কারখানা মালিকরা এরিমধ্যে সরকারের কাছে অর্থ সহায়তা চেয়েছেন৷ কিন্তু ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার বলেন, ‘‘সরকার সহায়তা করবে কি করবে না সেটার ওপর নির্ভর করা যাবে না৷ শ্রমিকদের সবেতন ছুটি দিতে হবে৷ নয়তো তারা টিকতে পারবেন না৷ মালিকরা কারখানা লে অফের পায়তারা করছেন৷ এটা হবে চূড়ান্ত অমানবিকতা৷ এত দিন তারা ব্যবসা করেছেন৷ এখন সংকটে তারা শ্রমিকদের দেখবেন না এটা কী করে হয়?”

বিশ্বব্যাংকের হিসেবে বাংলাদেশে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করেন৷ যারা দিন আনে দিন খায়৷ তার উপর রয়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষেরা৷ করোনায় শুধু তারাই নন, যারা চাকরিজীবী নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত সবাই সংকটে আছেন৷

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান জানান, ‘‘ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার জানিয়েছেন রাজবাড়ি, ফরিদপুরসহ তিনটি জেলায় যেখানে যৌনপল্লী আছে সেখানে কাজ না থাকায় খাদ্য সংকট শুরু হয়েছে৷ যেসব জেলায় লকডাউন করা হয়েছে সেখানেও খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে৷ আমরা জেলা প্রশাসকদের দেয়া চাহিদা অনুয়ায়ী খাদ্য সরবারের ব্যবস্থা করছি৷’’

তিনি জানান, ‘‘যারা নিম্ন আয়ের মানুষ, যারা কর্মহীন হয়ে পড়বেন তাদের আমরা মানবিক সহায়তা দেব৷ এজন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়ছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে৷’’

কিন্তু সারাদেশের মানুষের জন্য বিশেষ করে যারা নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত তাদের নিয়ে কোনো পরিকল্পনার কথা তিনি জানাতে পারেননি৷ আর লকডাউন হলে খাদ্য বা অন্যান্য সহায়তা কিভাবে মানুষের কাছে পৌঁছানো হবে তাও নিশ্চিত নন তিনি৷

নানা পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে এই নিয়ে কেন্দ্রীয় কোনো পরিকল্পনা নাই৷ বিচ্ছিন্নভাব যে যার মত কথা বলছেন৷ বিআইডিএস-এর অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘‘এখনই সরকার কেন্দ্রীয় উদ্যোগ নিয়ে একটি তহবিল গঠন করতে পারে৷ ত্রাণ ও দুর্যোাগ মন্ত্রণালয় পুরো বিষয়টি দেখতে সক্ষম হবে না৷ আর এটা তাদের একার পক্ষে সম্ভবও নয়৷’’

তিনি বলেন, ‘‘ওই তহবিলে শুধু সরকার নয়, দেশের বিত্তবানদেরও অংশ নেয়া উচিত৷ এই কাজে বিভিন্ন পর্যায়ের প্রশাসক ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা দরকার৷ জনপ্রতিনিধিদের মনে রাখতে হবে মানুষের জন্য এখন তাদের কাজ করার সময় এসেছে৷’’

তার মতে এখনই খাদ্য এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করে সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন৷ কারণ যারা এই কাজে যুক্ত হবেন তাদের স্বাস্থ্য নিরপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ৷ সেটা করা না হলে লকডাউনের সময় খারাপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে৷ বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ দুর্যোগে পড়বে৷

এই সময়ে চাকরি থেকে ছাঁটাই, কোনা প্রতিষ্ঠান লে অফ বা বেতন ভাতা নিয়ে কোনো টালবাহানা যাতে না করে সেই বিষয়টি নিশ্চিত করার তাগিদ দেন ড. নাজনীন৷ পোশাক শ্রমিকদের সবেতন ছুটির পাশাপাশি প্রয়োজনে একমাসের বেতন অগ্রিম দেয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি৷

এসএইচ-০৫/২৩/২০ (হারুন উর রশীদ স্বপন, ডয়চে ভেলে)