করোনা থেকে বাঁচলেও অনাহারে মারা যাবেন অনেকে!

প্রকাশিতঃ মার্চ ২৬, ২০২০ আপডেটঃ ১২:৪৬ অপরাহ্ন

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে ভারতে মঙ্গলবার মাঝরাত থেকে যে দেশব্যাপী লকডাউন শুরু হয়েছে সেই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই শহরাঞ্চলের বহু মানুষ শপিং মল বা পাড়ার দোকানগুলিতে ভিড় করে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিসও কিনে নিচ্ছেন।

তাদের ভয় দেরি হলে যদি ফুরিয়ে যায়!

এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের কাছে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য ও কাঁচাবাজার পৌঁছানোই একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পাইকারি বাজারগুলোতে কোনোভাবে খাদ্যদ্রব্য পৌঁছাচ্ছে ঠিকই, তবে তা মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা নেই – কারণ শহরে যান চলাচল বন্ধ।

প্রধানমন্ত্রী মোদী সারা ভারতে এবং তারও আগে রবিবার বিকেলে যখন পশ্চিমবঙ্গের অনেকগুলি শহরে লকডাউন ঘোষণা করেছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী – দুজনেই আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন যে মুদি দোকান বা সবজি বাজার খোলা থাকবে – তাই খাদ্য দ্রব্যের অভাব হবে না।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে অনেক দোকানেই পণ্য শেষ হতে শুরু করেছে – বাজারগুলিতে সবজি কম – যেটুকু থাকছে, তার দামও অনেক বেশি।

কলকাতার বৃহত্তম পাইকারি বাজার – কোলে মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতির প্রধান কমল দে বলছিলেন সমস্যাটা কোথায়।

“এক তো ট্রেন বন্ধ, তাই ট্রাকে করে গ্রামাঞ্চলের কৃষকদের অনেক বাড়তি খরচ করে শহরের পাইকারি বাজারে কৃষিপণ্য নিয়ে আসতে হচ্ছে। সেজন্য দাম তো বাড়ছেই। তাও কিন্তু তারা নিয়ে আসছেন বাজারে। সমস্যাটা হয়ে যাচ্ছে শহরের বাজারগুলোতে সেই সবজি পৌঁছানো।”

“লকডাউনের ফলে ছোট ট্রাকে করে খুচরো বাজারের যেসব দোকানি আসতেন, তারা আসতে পারছেন না। কিছু মানুষ আসছেন ভোর রাতের দিকে, সামান্য কিছু কিনে তারা ফিরে যাচ্ছেন। অথচ পাইকারি বাজারে সবজি পরে থাকছে,” ব্যাখ্যা করছিলেন মি. দে।

সবজির পাইকারি বাজার থেকে যেমন স্থানীয় বাজার বা খুচরো ব্যবসায়ীদের কাছে আনাজপত্র পৌঁছানো একটা সমস্যা, তেমনই অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও পৌঁছানো যাচ্ছে না ঠিক মতো।

কিছু অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে যে আন্তঃরাজ্য পরিবহন বন্ধ থাকার ফলে অন্যান্য রাজ্য থেকে জিনিস আসতে পারছে না ট্রাকে করে।

এশিয়ার বৃহত্তম পাইকারি বাজার – কলকাতার পোস্তা বাজারের মার্চেন্টস এসোসিয়েশনের সভাপতি সীতানাথ ঘোষ বলছিলেন, “এখন ট্রাক আসতে শুরু করেছে। কিন্তু রাজ্যের মধ্যেই পরিবহন ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় পোস্তা বাজারে যথেষ্ট জিনিস মজুত থাকা সত্ত্বেও খুচরো দোকানদারদের কাছে সেগুলো পৌঁছানো যাচ্ছে না।”

“লকডাউনটাও জরুরী। কীভাবে যে সরবরাহ ব্যবস্থা মসৃণ করা যায়, সে ব্যাপারে আমার কাছে এখনও কোনও দিশা নেই। এরকম চলতে থাকলে একটা সঙ্কট তো হবেই,” বলছিলেন সীতানাথ ঘোষ।

এতো গেল যাদের হাতে কিছুটা অর্থ আছে, সেইসব শহুরে মানুষের কাছে খাদ্যদ্রব্য সরবরাহে সমস্যার কথা।

কিন্তু এর বাইরে ভারতের জনসংখ্যার বৃহত্তম অংশ – যারা দিন আনেন দিনে খান, অর্থাৎ রিকশা বা ভ্যান চালক, গৃহকর্মী, দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করা শ্রমিক – তাদের অবস্থা আরও শোচনীয়।

লকডাউনের জেরে তারা কাজ করতে পারছেন না, এমন কি ট্রেন বন্ধ থাকায় গ্রাম থেকে শহর বা শহরতলিতে আসতেই পারছেন না।

এদের হাতে সঞ্চয়ও তেমন থাকে না, যা দিয়ে একসঙ্গে অনেক দিনের খাবার মজুত করতে পারবেন।

দক্ষিণ কলকাতার একটি রিকশা ইউনিয়নের নেতা সুশান্ত দেবনাথ বলছিলেন, “শহরে যারা রিকশা বা ভ্যান চালাতে আসেন, তাদের একটা বড় অংশই গ্রামে কাজ না পেয়ে চলে আসেন।”

“এখন ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে তারা আসতেও পারছেন না, আবার ওদিকে লকডাউন। আমরা জানি না এরা কীভাবে বেঁচে থাকবেন যদি না সরকার অনুদান দেওয়ার ব্যবস্থা করে। হয়তো করোনাভাইরাসের আক্রমণ থেকে বেঁচে যাবেন এরা, কিন্তু অনাহারেই তো মারা যাবেন অনেকে।”

খাবার ছাড়াও বহু মানুষের প্রয়োজন চিকিৎসার। ওষুধের দোকান খোলা রাখা হচ্ছে ঠিকই শহরে, কিন্তু গ্রামের দিকে ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য ব্যধিতে যারা আক্রান্ত, তারা নিয়মিত ডাক্তার দেখাতে শহরে আসবেন কীভাবে, সেটা নিয়ে চিন্তায় আছে অনেকে।

আবার জীবনদায়ী ওষুধ তারা যোগাড়ই বা করবেন কীভাবে গ্রামে বসে। সেটা তাদের একটা দুশ্চিন্তা।

সরকার এখনও পর্যন্ত নির্দিষ্ট ভাবে পরিকল্পনা ঘোষণা করে নি।

তবে আজ মন্ত্রীপরিষদের বৈঠকের পরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রকাশ জাভরেকর এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন দারিদ্র সীমার নীচে থাকা ৮০ কোটি মানুষকে প্রতিমাসে সাত কেজি গম দু’টাকা দরে আর তিনটাকা কিলো দরে চাল দেওয়া হবে।

আগামী তিন মাসের জন্য এই ব্যবস্থা করছে কেন্দ্রীয় সরকার।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীও দারিদ্রসীমার নীচে থাকা মানুষদের জন্য মাসিক এক হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদানের কথা ঘোষণা করেছেন।

এসএইচ-০৭/২৬/২০ (অমিতাভ ভট্টশালী, বিবিসি)