ফেসবুকে বিতর্কিত পোস্ট, পূজার আগে হিন্দুরা আতঙ্কে

ফেসবুকে বিতর্কিত পোস্টকে কেন্দ্র করে আবারও ভোলায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে৷ দুর্গাপূজার আগে এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত সেখানকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা৷

ভোলা জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি গৌরাঙ্গ চন্দ্র দের ফেসবুক মেসেঞ্জার থেকে গত ১৫ সেপ্টেম্বর জয়রাম নামে এক ব্যক্তির সাথে চ্যাটিংয়ের স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে৷ সেখানে ইসলাম ধর্মের মহানবীকে নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক কথাবার্তা রয়েছে৷

ঘটনাটি জানার পর রাতেই ভোলা সদর থানায় নিজের ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়েছে দাবি করে সাধারণ ডায়েরি করেন গৌরাঙ্গ চন্দ্র দে৷ তার দাবি, এই ধরনের কোনো কথাবার্তা তিনি কারও সঙ্গে বলেননি৷

এদিকে, এমন স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ার পর সেখানকার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে৷ পরদিন সকালেই ভোলা জেলা মুসলিম ঐক্য পরিষদের ব্যানারে মুসল্লিরা আন্দোলন শুরু করেন৷

তবে বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত আছে বলে জানিয়েছেন ভোলা জেলা প্রশাসক মো. তৌফিক-ই-লাহী চৌধুরী৷ তিনি বলেন, ‘‘পরিস্থিতি এখন শান্ত৷ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আছে৷’’

আর কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে বলে জানিয়েছেন ভোলা জেলার পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার৷ তাছাড়া ঘটনাটি কে ঘটিয়েছে তা জানতে প্রশাসন ইতিমধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছেন বলেও জানান তিনি৷

তিনি বলেন, ‘‘প্রশাসন সতর্ক অবস্থায় আছে৷ গৌরাঙ্গের বাড়িতে পুলিশ পাহাড়া দেওয়া হয়েছে৷ ঘটনাটি কে ঘটিয়েছে, সেটা বের করতে আমরা ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়েছি৷ জবাব পেলে আসল ঘটনাটি বুঝতে পারবো৷’

এদিকে, পুলিশ গৌরাঙ্গকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে৷ ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে কারাগারেই আছেন গৌরাঙ্গ৷ আর নিরাপত্তার ভয়ে ওই দিন থেকে তার পরিবারের কেউই বাড়ির বাইরে যাচ্ছেন না৷ তাদের বাড়িতে পুলিশ পাহারাও বসানো হয়েছে৷

গৌরাঙ্গের ছোট ভাই রাম চন্দ্র দে ভুট্টু বলেন, ‘‘ওই দিনের পর থেকে আমরা বাড়ির বাইরে যাই না৷ অনেকে অনেক কথা বলছে৷ আসলে শুধু আমরা না, আমাদের কমিউনিটির সবাই আতঙ্কের মধ্যে আছে৷ বাজারে আমাদের দোকানও সেই দিন থেকে বন্ধ৷ একটা শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যে আছি আমরা৷’’

গৌরাঙ্গের আরেক ভাই রাজ কুমার দে বলেন, ‘‘আমরা আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করছি৷’’

এদিকে, গৌরাঙ্গের বিষয়টি সাংগঠনিকভাবে দেখভাল করছেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নির্মল চ্যাটার্জি৷ দূর্গাপূজার কয়েকদিন আগে এমন ঘটনায় তারা উদ্বিগ্ন বলে জানান তিনি৷

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের এই নেতা বলেন, ‘‘দূর্গাপূজার মাত্র কয়েকদিন আগে ভোলার এই ঘটনা আমাদের উদ্বিগ্ন করেছে৷ আমি কয়েক দফা ভোলার প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি৷ তারা আশ্বাস দিয়েছেন, পূজায় পরিবেশ নির্বিঘ্ন থাকবে৷ এখন ভোলার এই ঘটনা যদি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে তো এর প্রভাব পড়বেই৷ তাই আমরা আশা করছি, নির্দোষ গৌরাঙ্গ পূজার আগেই মুক্তি পাবেন৷ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই ধরনের ঘটনা সত্যি আমাদের চিন্তিত করে৷’

ভোলা জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অসীত সাহা বলেন, ‘‘জয়রাম নামে কাউকে আমরা চিনি না৷ এ নামে আদৌ কেউ আছে কি না, তাও আমরা জানি না৷ ঘটনার পর গৌরাঙ্গ দাদার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে৷”

তিনি বলেন, ”তার (গৌরাঙ্গ চন্দ্র দের) ফেসবুক আইডি হ্যাকড হয়েছে এবং কারা এটা করেছে তা গৌরাঙ্গ জানেন না৷ নিরাপত্তা চেয়ে ওই দিন রাতেই তিনি জিডি করেন৷ তারপরও তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে৷’’

এই ঘটনাকে ‘ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দিয়ে অসীত সাহা বলেন, ‘‘ভুয়া একজন মানুষের সঙ্গে তিনি কেন এমন কথা বলবেন৷ আর ৮/১০ দিন পর দূর্গাপূজা৷ ভোলায় ১১৫টি মন্দিরে এবার পূজা হচ্ছে৷ যদিও এখন পর্যন্ত কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি৷ কিন্তু পূজার ঠিক আগ মুহূর্তে সবাই তো আতঙ্কের মধ্যে আছেন৷ আমি গত পরশুদিনও এসপির সঙ্গে দেখা করেছি৷’’

তিনি বলেন, ‘‘আমরা বারবার বলেছি, যে অপরাধ করেছে তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসেন৷ সে যেই হোক৷ কিন্তু পূজার আগে পরিস্থিতি শান্ত হওয়া দরকার৷ বারবার ফেসবুকে বিতর্কিত পোস্টকে কেন্দ্র করে ভোলায় সংখ্যালঘুরা সবসময় আতঙ্কে থাকেন৷’’

ঘটনার পর থেকে আন্দোলন শুরু করেছে ভোলা জেলা মুসলিম ঐক্য পরিষদ৷ সংগঠনের সম্পাদক মাওলানা মোহাম্মদ মোবাশ্বিরুল হক নাইম বলেন, ‘‘বারবার ভোলায় রাসুলকে নিয়ে কটুক্তি করা হবে, আর আমরা আন্দোলন করব না এটাতো হয় না৷ গত ২৭ সেপ্টেম্বর আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি৷ আমরা বলেছি, এটা নিয়ে সংসদে আইন করতে হবে৷ শুধু মুসলিম না, যে কোন ধর্মের বিরুদ্ধে কটুক্তি করলে একই শাস্তি হতে হবে৷

তিনি বলেন, ‘‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছি৷ কিন্তু মানুষের মধ্যে চাপা ক্ষোভ আছে৷’’

কেন গৌরাঙ্গের শাস্তি চাইছেন আপনারা এমন প্রশ্নের জবাবে মাওলানা মোবাশ্বিরুল হক বলেন, ‘‘ঘটনার পরপরই গৌরাঙ্গ থানায় জিডি করে বলল, তার আইডি হ্যাকড হয়েছে৷ ভালো কথা৷ কিন্তু কয়েক ঘন্টা পরই তিনি আবার ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বললেন, আমার আইডি হ্যাক হয়েছে৷ হ্যাকড হলে তিনি আবারও প্রবেশ করলেন কীভাবে? ফলে আমরা বলছি, এই ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা আছে৷ আর যদি ধরেও নেই, তিনি এটা করেননি, তাহলে কে করেছে সেটা প্রশাসন বলুক৷’’

তিনি বলেন, ‘‘২০১৯ সালে বোরহানউদ্দিনে একটা ঘটনা ঘটল, ২০২০ সালে মনপুরায় ঘটল, এবার সদরে একই ঘটনা৷ কিন্তু কোনো ঘটনারই তো সুরাহা হচ্ছে না৷ যদি আইডি হ্যাক হয় তাহলে যে হ্যাক করেছে তাকে প্রশাসন ধরুক, বিষয়টি সবার সামনে প্রকাশ করুক, তাহলে তো আর সমস্যা থাকবে না৷’

গত কয়েক বছর ধরে প্রায়ই বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা ভোলায় সাম্প্রদায়িক হামলার খবর পাওয়া যায়৷

২০১৯ সালের ১৮ অক্টোবর বোরহানউদ্দিন উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নে ‘বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্য শুভ’ নামে এক ব্যক্তির ফেসবুক আইডি থেকে মহানবীকে কটুক্তি করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া হয়৷ তখন বিপ্লব দাবি করেছিলেন, তার ফেসবুক আইডি হ্যাক করে একটা পোস্ট দেওয়া হয়েছে৷ এই ঘটনার প্রতিবাদে ২০ অক্টোবর বোরহানউদ্দিন ঈদগাহ মসজিদের সামনে ‘মুসলিম তৌহিদী জনতার’ ব্যানারে বিক্ষোভ শুরু হয়৷ পরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে ৪ জন মারা যান৷

মাওলানা মোবাশ্বিরুল হক বলেন, ‘‘এই ঘটনায়ও পোস্টটি কে করেছিলেন আমরা জানতে পারিনি৷ অথচ চারজন নিরীহ মুসল্লিকে জীবন দিতে হয়েছে৷’’

এ বিষয়ে ভোলা জেলার পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার বলেন, ‘‘ওই ঘটনাটিতে কে সম্পৃক্ত ছিল, সেটা আমরা বের করেছি৷ ওই হ্যাকারকে আমরা গ্রেফতার করেছি৷ তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন৷ আদালতে তার বিরুদ্ধে চার্জশিটও দেওয়া হয়েছে৷ কিন্তু স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় এগুলো তো প্রকাশ্যে বলা যায় না৷ এই কারণে ওই হ্যাকারের পরিচয়ও আমরা প্রকাশ করিনি৷’’

পরের বছর ২০২০ সালের ১৩ মে মনপুরা উপজেলার সিতাকুন্ডে ‘শ্রীরাম চন্দ্র দাস’ নামে এক ব্যক্তির ফেসবুক আইডি থেকে মহানবীকে কটুক্তি করে পোস্ট দেওয়া হয়৷ এই ঘটনায়ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে৷ কোন হাতাহতের ঘটনা না ঘটলেও কয়েকদিন ধরে সেখানে উত্তেজনা চলমান ছিল৷ পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার বলেন, এই ঘটনাটিও আমরা শনাক্ত করেছি৷

তবে সাম্প্রদায়িক এমন হামলার পেছনে রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি থাকে বলেও মনে করেন কেউ কেউ৷ ভোলার একজন প্রবীণ সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘‘সবগুলো ঘটনার পেছনেই রাজনীতি আছে৷ সরকার দলীয় রাজনীতির নানা গ্রুপ, উপ-গ্রুপ এখানে কাজ করে৷ সর্বশেষ যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটার পেছনের ঘটনা দেখলেই বুঝবেন৷’’

তিনি বলেন, ‘‘গৌরাঙ্গ চন্দ্র দে’তো আওয়ামী লীগের সক্রিয় রাজনীতি করেন৷ আগে কার সঙ্গে রাজনীতি করতেন, ঘটনার আগে তিনি কেন কোনঠাসা হয়ে পড়েছিলেন? কারা তাকে শিক্ষা দিতে চাইছে? এই বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত করলেই পুরো ঘটনা পরিস্কার হয়ে যাবে৷’’

এসএইচ-০৬/০৩/২১ (সমীর কুমার দে, ডয়চে ভেলে)

Exit mobile version