বাংলাদেশ ব্যাংক

২২ ক্যারেট সোনা হয়ে যায় ১৮!

প্রকাশিতঃ জুলাই ১৮, ২০১৮ আপডেটঃ ৯:৪২ অপরাহ্ন

বাংলাদেশ ব্যাংকে জমাকৃত স্বর্ণ ও স্বর্ণালঙ্কারের কেস টু কেস পরিদর্শন সংক্রান্ত এক গোপনীয় প্রতিবেদনে একটি আশঙ্কার বিষয়টি উল্লেখ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। এ বছরের জানুয়ারিতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানকে এ প্রতিবেদনটি পাঠানো হয়েছে। আশঙ্কার বিষয়টি হলো, চোরাচালানের দায়ে আটক সোনা বাংলাদেশ ব্যাংকে নথিভুক্ত করার সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা ২২ ক্যারেটের স্থলে ১৮ ক্যারেট হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এতে করে আটক করা সোনা পরবর্তীতে নিলাম বা অন্য উপায়ে বিক্রি করলে ক্যারেট অনুযায়ী সোনার দামের হেরফেরে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাবে সরকার,আর সুবিধা পাবে সোনা ক্রেতারা। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর গত ৩ বছরের আলোচিত আটককৃত সোনাগুলো ‘কেস টু কেস’ পরিদর্শনের জন্য একই অধিদফতরের একজন যুগ্ম পরিচালকের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি টিম গঠন করে গত ২০১৬ সালের ২৪ মার্চ। পরবর্তী ২০১৭ সালের ১৭ জানুয়ারি থেকে এই কমিটি কাজ শুরু করে।

পরিদর্শক টিমটি আলোচিত ২২৭ টি মামলার বিপরীতে ৯৬৩.৪০৪ কেজি সোনার অলঙ্কার, সোনার বার ও সোনার কাটপিস যাচাই বাছাই করেন। প্রতিবেদন পর্যালোচনার দ্বিতীয় নম্বরে উল্লেখ করা হয়েছে, পরিদর্শনকালে দেখা যায়, প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক স্বর্ণালঙ্কার জমা গ্রহণান্তে প্রদত্ত সনদ অনুযায়ী স্বর্ণালঙ্কারের বিশুদ্ধতা ৮০% অর্থাৎ ১৮ ক্যারেট কিন্তু পরিদর্শনকালে বিশুদ্ধতা প্রায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ২২ ক্যারেট বা ৯১.৭৪% পাওয়া যায়।

আরও খবর: বিশ্বে অভ্যন্তরীণ মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয়

উচ্চ ক্যারেট সম্পন্ন স্বর্ণালঙ্কারকে নিম্ন ক্যারেটের স্বর্ণালঙ্কার হিসেবে গ্রহণ করায় উক্ত স্বর্ণ নিলামে বা অন্যবিধ উপায়ে বিক্রয় করা হলে সরকার অতিরিক্ত ক্যারেটের বিপরীতে প্রযোজ্য অর্থ হতে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক সোনার অলঙ্কার, সোনার বার ও সোনার কাটপিস জমা নেওয়ার সময় যে ওজন উল্লেখ করা হয় পরিদর্শনের তার চেয়ে বেশি পাওয়া যায় বলে পর্যালোচনার তৃতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে।

এ প্রতিবেদনে অন্য সোনার বারগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া সনদের চেয়েও বেশি ক্যারেট বা বিশুদ্ধতা থাকার কথা উল্লেখ করা হলেও একটি সোনার চাকতি ও সোনার রিংয়ে লিপিবদ্ধ পরিমাণের চেয়েও অনেক কম পরিমাণ সোনা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, গোলাকার কালো প্রলেপযুক্ত সোনার চাকতি এবং একটি কালো প্রলেপযুক্ত সোনার রিং ২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক চাকতি ও রিং গ্রহণ করার সময় ৮০% বিশুদ্ধ হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু,পরিদর্শনে তা পরীক্ষা করে পাওয়া যায় ৪৬.৬৬% বিশুদ্ধ। পরিদর্শনে বলা হয়, ওই চাকতি এবং রিং আদৌ সোনা দিয়ে বানানো নয় অর্থাৎ শংকর ধাতুর সমন্বয়ে তৈরি। সোনার বদলে অন্য ধাতু পাওয়ায় সরকারের এক কোটি এগার লাখ সাতাশি হাজার ছিয়াশি টাকা পঞ্চাশ পয়সা ক্ষতি সাধিত হয়েছে।

গত ১৭ জুলাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কারেন্সি অফিসার আওলাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, ২২ ক্যারেটের জায়গায় ১৮ ক্যারেট হওয়ার বিষয়টি দুটি ভিন্ন যন্ত্রে পরিমাপের কারণে হয়েছে। শুল্ক গোয়েন্দারা যখন সোনা জমা রাখেন, তখন হয়ত তাদের মেশিনে ২২ ক্যারেট দেখিয়েছিল, কিন্তু আমাদের মেশিনে সেটি ১৮ ক্যারেটই হয়েছিল। চিঠি দিয়ে বিষয়টি শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগকে অবহিত করা হয়েছে জানিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমরা বলেছিলাম, আণবিক শক্তি কমিশনের মেশিন দিয়ে ওই সোনা মাপা হোক। তখন তারা রাজি না হয়ে বিষয়টি মেনে নিয়েছিলেন।

শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতর এবং এনবিআর যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে এ বিষয়ে জানতে চেয়েছিল, তখন সার্বিক বিষয়টি তাদের কাছে স্পষ্ট করা হয়েছে। সর্বশেষ ১১ জুলাই এনবিআর চেয়ারম্যানকে অবহিত করা হয়েছে। ২২ ক্যারেটের সোনা কেন ১৮ ক্যারেট হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং পরিদর্শনে কী পাওয়া গেছে জানতে চাইলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মো. সহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা পরিদর্শনে যা পেয়েছি তাই প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছি। এখন কী কারণে তারা ২২ ক্যারেটের স্থলে ১৮ ক্যারেট লিখে নথিভুক্ত করেছে তা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষই বলতে পারবে। আর কেন কম ক্যারেট উল্লেখ করা হয়েছে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে বের করবে। এক্ষেত্রে আমার কিছু বলার নেই।

এ প্রতিবেদনে পাঁচটি সুপারিশ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর:

১. কাস্টম হাউজের ভিজিআর নম্বর ১১১০/১৪ মূলে জমাকৃত গোলাকার কালো প্রলেপযুক্ত সোনার চাকতি এবং একটি কালো প্রলেপযুক্ত সোনার রিং বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ৮০% বিশুদ্ধ সোনা হিসেবে গ্রহণ করা হয় কিন্তু পরিদর্শন দল কর্তৃক উক্ত জি আর/ভিজিআরভুক্ত চাকতি এবং রিং পরীক্ষা –নিরীক্ষা করে অন্য ধাতব বস্তুর পাওয়ায় উক্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের দায় দায়িত্ব নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার নিমিত্ত যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা যেতে পারে।

২. কাস্টম হাউস কর্তৃক বাংলাদেশ ব্যাংকে সোনার অলঙ্কার, সোনার বার ও সোনার কাটপিস ইত্যাদি জমা প্রদানের সময় অবশ্যই সঠিকভাবে সোনার ওজন এবং সোনার মান (ক্যারেট) পরীক্ষা করে জমা প্রদান করার জন্য কাস্টম হাউসের দায়িত্বপ্রাপ্ত গুদাম কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা যেতে পারে।

৩. কাস্টম হাউস কর্তৃক বাংলাদেশ ব্যাংকে সোনার অলঙ্কার,সোনার বার ও সোনার কাটপিস ইত্যাদি জমা দেওয়ার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেও সঠিকভাবে স্বর্ণের ওজন এবং স্বর্ণের মান (ক্যারেট) পরীক্ষা করে জমা গ্রহণ করার জন্য নির্দেশনা প্রদানের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা যেতে পারে।

৪. প্রত্যেক মামলার সংশ্লিষ্ট সোনার অলঙ্কার,সোনার বার ও সোনার কাটপিস ইত্যাদি মামলাওয়ারি পৃথকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে কাস্টম হাউসের যথাযথ কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়ার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা যেতে পারে।

৫. প্রত্যেক মামলার সংশ্লিষ্ট সোনার অলঙ্কার, সোনার বার ও সোনার কাটপিস ইত্যাদি মামলা ওয়ারি পৃথকভাবে সংরক্ষণ করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেও নির্দেশনা দিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা যেতে পারে।

এমও-২১/১৮-০৭ (ন্যাশনাল ডেস্ক, তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন)