দুদক পরিচালককে ডিআইজি মিজানের ঘুষ দেওয়ার অডিও ফাঁস

প্রকাশিতঃ জুন ১০, ২০১৯ আপডেটঃ ৫:১১ অপরাহ্ন

নারী কেলেঙ্কারি, অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ নানা অভিযোগে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার হওয়া পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমানের কাছ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরের ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার সময়কার কথপোকথন ফাঁস হয়েছে।

বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন নিউজ প্রচারিত ‘বিশেষ সংবাদে’ ঘুষ লেনদেনের সপক্ষে ডিআইজি মিজান ও এনামুল বাছিরের মোবাইল কথোপকথনের কয়েকটি অডিও ক্লিপও শোনানো হয়। এই অভিযোগ ওঠার পর রোববারই দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখতকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রনব কুমার ভট্টাচার্য্য। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন দুদকের মহাপরিচালক (প্রশাসন) সাঈদ মাহবুব খান এবং মহাপরিচালক (লিগ্যাল) মফিজুল ইসলাম ভূইয়া।

অডিও ক্লিপিংস থেকে জানা চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রথমে ২৫ লাখ ও পরে ১৫ লাখ টাকা দিয়েছেন মিজানুর। কিন্তু ২ জুন খন্দকার এনামুল বাসির মিজানুরকে জানান, তিনি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। তবে দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনারের চাপে তাঁকে অব্যাহতি দিতে পারেননি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মিজানুর টাকাপয়সা লেনদেনের সব কথা ফাঁস করে দেন। প্রমাণ হিসেবে হাজির করেন এনামুল বাসিরের সঙ্গে কথোপকথনের একাধিক অডিও রেকর্ড।

ডিআইজি মিজানের অভিযোগ, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দুদক কর্মকর্তা এনামুল বাছির তার কাছে ২৮ বছরের বেতনের রসিদ ও জাতিসংঘ মিশন থেকে আয়ের কাগজপত্র চান। মিজানুর দুদক কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করে সব কাগজপত্র দিয়ে আসেন। এনামুল বাসির তাঁকে একটি টিঅ্যান্ডটি নম্বর দিয়ে কথা বলতে বলেন। মিজানুর ফোন করলে এনামুল বাসির তাঁর সঙ্গে রমনা পার্কে দেখা করতে বলেন।

মিজানুর ১১ জানুয়ারি দেখা করতে যান। এনামুল তাঁকে বলেন, তাঁর ফাইলে যে কাগজপত্র আছে, তাতে মিজানুরকে ধরার কোনো উপায় নেই। কিন্তু টাকাপয়সা ছাড়া তিনি মিজানুরের পক্ষে প্রতিবেদন দিতে পারবেন না। তিনি শুরুতে ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন। একপর্যায়ে ৪০ লাখ টাকায় রফা হয়।

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ১৫ জানুয়ারি ও ১ ফেব্রুয়ারি রমনা পার্কে এই ঘুষ লেনদেন হয়। ঘুষের টাকা দেওয়ার পর মিজানুর তদন্ত প্রতিবেদন তাঁর পক্ষে দেওয়ার জন্য চাপ দিতে শুরু করেন। গত ২ জুন পুলিশ প্লাজায় মিজানুরের স্ত্রী সোহেলিয়া আনার রত্নার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দেখা করতে গিয়ে দুদক পরিচালক এনামুল বাছির জানান, কাজটা তিনি করতে পারেননি। ওই সময় তিনি জানান, অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। এর ভেতরেও (প্রতিবেদন) কিছু পয়েন্ট রাখা হয়েছে। চাপে পড়েই প্রতিবেদন দিতে বাধ্য হয়েছেন দুদকের এ পরিচালক।

এটিএন নিউজের ওই সংবাদে ডিআইজি মিজান ঘুষ দিতে ‘বাধ্য হয়েছেন’ দাবি করে বলেন, আমি তো বাধ্য হয়েছি। আমি যদি কোনো অন্যায় করে থাকি, তাহলে আমার বিচার হোক। একজন দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তার যদি বিচার না হয়, দুর্নীতি দমন কমিশন যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, তাহলে এই দেশে কখনই দুর্নীতি দমন হবে না।

ডিআইজি মিজান আরও বলেন, এনামুল বাছির আমার কাছ থেকে টাকা নিয়েছে। তার অডিও আমি আপনাকে দিয়েছি এবং কত টাকার নোট এনেছি, কীভাবে দিয়েছি, ওইটা স্পষ্ট তার স্টেটমেন্ট রেকর্ডে আছে।

দুদক কর্মকর্তা এনামুল বাসির অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন অডিও রেকর্ডটি বানোয়াট। তিনি টাকাপয়সা নেননি। তিনি গত মাসের শেষ দিকে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন এবং মিজানুরের বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করেছেন।

ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ তুলে দুদক কর্মকর্তা বলেন, আমার দপ্তরে তিনি অসৎ উদ্দেশ্যে এসেছিলেন। যে কারণে আমার সাথে তার যেসব সামাজিক কথাবার্তা হয়েছে, সেগুলো তিনি রেকর্ড করেছেন। এসব কথার সাথে আধুনিক প্রযুক্ত ব্যবহার করে, কিছু কথা টেম্পারিং করে এই অডিওটি তৈরি করেছেন।

গত বছরের ৩ মে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ডিআইজি মিজানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। প্রথমে অনুসন্ধান কর্মকর্তা ছিলেন দুদকের উপ-পরিচালক ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারী; পরে এই দায়িত্ব পান এনামুল।

ডিআইজি মিজানুর ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত জানুয়ারির শুরুর দিকে তাঁকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। বিয়ে গোপন করতে নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম আক্তারকে গ্রেপ্তার করানোর অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। তখন তাঁর বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে।

মিজানুরের বিরুদ্ধে এক সংবাদ পাঠিকাকে প্রাণনাশের হুমকি ও উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে বিমানবন্দর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) রয়েছে। গত বছরের ৩ মে অবৈধ সম্পদসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে মিজানুরকে দুদক কার্যালয়ে প্রায় সাত ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে মিজানুর রহমান ও তাঁর প্রথম স্ত্রী সোহেলিয়া আনারের আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ কোটি টাকারও বেশি সম্পদের খোঁজ পায় দুদক। মিজানুরের নামে ৪৬ লাখ ৩২ হাজার ১৯১ টাকা এবং স্ত্রীর নামে ৭২ লাখ ৯০ হাজার ৯৫২ টাকার অসংগতিপূর্ণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের খোঁজ পাওয়ার কথা দুদকের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। তদন্ত শুরু হওয়ার এক বছরের মাথায় দুদক পরিচালকের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার এই অভিযোগ পাওয়া গেল।

বিএ-১১/১০-০৬ (ন্যাশনাল ডেস্ক)