আগে থেকেই ছাত্রলীগের টার্গেটে ছিলেন ফাহাদ

প্রকাশিতঃ অক্টোবর ১০, ২০১৯ আপডেটঃ ৪:৫০ অপরাহ্ন

আগে থেকেই ছাত্রলীগের টার্গেটে ছিলেন বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভিন্নমত প্রকাশ করে পোস্ট দেয়ায় টার্গেটে পড়েন তিনি।

শিবিরপন্থী’ হিসেবে শনাক্ত করে তাকে ‘ট্রিটমেন্ট দিতে’ (নির্যাতন চালাতে) বলেছিলেন বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুহতাসিম ফুয়াদ।

গত রোববার রাতে নিজ কক্ষে ঘুমন্ত আবরার ফাহাদকে ডেকে ২০১১ নম্বর কক্ষে নিয়ে যান ছাত্রলীগকর্মী ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মুনতাসির আল জেমি এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এহতেশামুল রাব্বি তানিম।

তার ওপর দফায় দফায় নির্যাতনের নেতৃত্ব দেন তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার।

ফাহাদ হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তারকৃত ১৩ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে (বহিষ্কৃত) জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা।

হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তরা প্রমাণ গায়েবের চেষ্টা করেছেন বলেও আলামত পাওয়া গেছে।

পুলিশ ও সহপাঠীরা জানিয়েছেন, ফাহাদের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তার মৃতদেহ ২০০৫ নম্বর কক্ষে নিয়ে ২০১১ নম্বর কক্ষটি পরিষ্কার করা হয়।

ওই কক্ষ থেকে নির্যাতনের আলামত সরিয়ে ফাহাদের কক্ষ থেকে তার নতুন পোশাক আনা হয়। হত্যাকাণ্ডকে গণপিটুনি বলে চালাতে প্রথমে ফাহাদকে শিবিরের নেতা বলে প্রচার করা হয়।

একপর্যায়ে কৌশল পাল্টে ফাহাদ মাদক কারবারি বলেও গুজব ছড়ানো হয়। নিহতের কক্ষে মাদকদ্রব্য রাখার চেষ্টা পাহারা দিয়ে রুখে দিয়েছেন বলে দাবি করেন কয়েকজন সহপাঠী।

এ ছাড়া ঘটনার পরে পুলিশকে শেরেবাংলা হল থেকে আলামত সংগ্রহে বাধা দেয়া হয়।

এদিকে, প্রথম দফায় ১০ জনের পর বুয়েটের তিন শিক্ষার্থীর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল বুধবার ঢাকা মহানগর হাকিম তোফাজ্জাল হোসেন তাঁদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ওই তিন শিক্ষার্থী হলেন শামসুল আরেফিন রাফাত (২১), মনিরুজ্জামান মনির (২১) ও আকাশ (২১)।

অন্যদিকে, গতকাল ধানমণ্ডি এলাকা থেকে শাখাওয়াত ইকবাল অভি নামে আবরার ফাহাদের এক সহপাঠীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার মাসুদুর রহমানবলেন, ‘নির্যাতনে হত্যার পর ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নেয়ার চেষ্টা করেছিলেন তারা। এ কারণে প্রথমে পুলিশকে সেখানে ঢুকতেও দেয়া হয়নি।

কিছু আলামত সরিয়েও ফেলা হয়। তবে পরবর্তী তদন্তকালে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজসহ বেশ কিছু আলামত জব্দ করা গেছে।’

তদন্তসংশ্লিষ্ট ও বুয়েটের একাধিক সূত্র জানায়, বেশ কিছুদিন ধরেই আবরারের ফেসবুকে নজরদারি করছিলেন বুয়েট ছাত্রলীগের কিছু নেতা। তারা আবরার ফাহাদকে কট্টর শিবির বলে সন্দেহ করেন।

এ ছাড়া ভিন্ন মতাদর্শীদের কক্ষে ডেকে নিয়ে হুমকি ও নির্যাতন চালাতেন তারা। ৩ অক্টোবর একটি ফেসবুক পোস্টের কারণে ফাহাদকে ২০১১ নম্বর রুমে ডেকে সতর্ক করেছিলেন ছাত্রলীগের আইনবিষয়ক উপসম্পাদক এবং পুরকৌশল বিভাগের ছাত্র অমিত সাহা।

হত্যাকাণ্ডের দিন রাসেল ও ফুয়াদ আবরারকে মারধর করার কথা বলেন। এটাকে তাদের ভাষায় ‘ট্রিটমেন্ট দিতে’ বলা হয়। তবে হত্যা-নির্যাতনের সময় প্রকাশিত সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে অমিত, রাসেল ও ফুয়াদকে প্রথমে দেখা যায়নি।

সূত্র জানায়, ডিবির জিজ্ঞাসাবাদের সময়ও আসামিরা একে অন্যকে দোষ দিচ্ছেন। তারা বেদম মারা ঠিক হয়নি বলেও মন্তব্য করছেন। কেউ কেউ বলছেন, আগের মতোই নির্যাতন চালাবেন ভেবেছিলেন তারা। ফাহাদ মারা যাবে, সেটা ভাবেননি।

জানতে চাইলে চকবাজার থানার ওসি সোহরাব হোসেন বলেন, ‘ভোররাতে আমাদের (পুলিশকে) খবর দিয়েও তারা আর হলে ঢুকতে দেয়নি। তারা বলছিল, ‘শিবির ধরা পড়েছে, তাকে নিয়ে যান’।

কিন্তু পুলিশ গেলে তাদের হলে ঢুকতে দেয়নি। তারা লাশ অনেকক্ষণ আটকে রেখেছিল। পরে শিক্ষকরা আসার পর আমরা লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠাই।’

প্রসঙ্গত, রোববার রাতে মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে হত্যার ঘটনায় তাঁর বাবা বরকত উল্লাহ সোমবার রাতে ১৯ জনকে আসামি করে চকবাজার থানায় মামলা করেন।

বিএ-০১/১০-১০ (ন্যাশনাল ডেস্ক)