‘ব্ল্যাক ক্যাফে’র ব্ল্যাক কাহিনী!

প্রকাশিতঃ মে ২৫, ২০১৮ আপডেটঃ ৪:৪২ অপরাহ্ন

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের (রামেক) মিলানায়তন সংলগ্ন একটি তিনতলা ভবনে গড়ে তোলা হয়েছে ‘ব্ল্যাক ক্যাফে’ নামে একটি রেস্তোরাঁ। রেস্তোরাঁটির মালিকের নাম আসলাম সরকার। ব্ল্যাক ক্যাফের পাশের তিনতলা ভবনটিও ভাড়া নিয়ে তিনি ‘সরকার প্রোডাকশন হাউস’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান চালান। রাজশাহীতে মিউজিক ভিডিও নির্মাণের কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে আসলাম সরকার শুটিংয়ের আড়ালে রাজশাহীর ইয়াবা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন। বুধবার সকালে কক্সবাজারে একলাখ আট হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন তিনি।

জানা গেছে, ব্ল্যাক ক্যাফে ঘিরেই আসলাম সরকার গড়ে তুলেছেন এক অন্ধকার জগৎ। আর ক্যাফেটির পাশের প্রোডাকশন হাউসে কথিত মডেলদের এনে চালাতেন অসামাজিক কার্যকলাপ। ক্যাফেটির খাবারের মান তেমন ভালো নয়। অন্যসব রেস্তোরাঁর মতো এখানে ভোজন রসিকদের উপচেপড়া ভিড়ও থাকে না। তবে এক শ্রেণির তরুণ-তরুণীদের যাতায়াত রয়েছে এই রেস্তোরাঁয়। এদের বেশিরভাগই মরণনেশা ইয়াবায় আসক্ত। অভিযোগ রয়েছে, ক্যাফেটিতে মাদক সেবনসহ চলে নানা অসামাজিক কার্যকলাপ।

আসলাম সরকার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারের বিষয়টি প্রকাশের পর রাজশাহীতে চলছে তোলপাড়। এতদিন গোপন থাকলেও এখন বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন মহলকে ‘ম্যানেজ’ করে আসলাম তার বিশাল মাদক নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন। আর এর ফলে মাত্র ৪০ বছর বয়সেই শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন রাজশাহীর এই ইয়াবা স¤্রাট। আসলাম সরকার নগরীর রজপাড়া থানার ডিঙ্গাডোবা এলাকার আজিজুল আলমের ছেলে।

আরও খবর: চুরি ঠেকাতে লিচু গাছে বৈদ্যুতিক ফাঁদ!

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্ল্যাক ক্যাফে আর সরকার প্রোডাকশন হাউসে রাতভর চলে উঠতি বয়সি তরুণ-তরুণীদের আড্ডা। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং রাজশাহীর ধনীর দুলালদের এখানে রয়েছে নিয়মিত যাতায়াত। এ দুটি প্রতিষ্ঠানে ইয়াবা এবং ফেনসিডিলসহ অন্য মাদকদ্রব্যেরও সরবরাহ রয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটিতে উঠতি বয়সি মাদকাসক্তরা নির্বিঘ্নে মাদকসেবন করার সুযোগ পান। রাজশাহীর পুলিশ-প্রশাসন তাদের কখনও ‘বিরক্ত’ করে না।

অভিযোগ রয়েছে, ব্ল্যাক ক্যাফে থেকেই রাজশাহী অঞ্চলের মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের সিন্ডিকেট পরিচালনা করেন। পুলিশের খাতায় নিখোঁজ মোস্ট ওয়ানটেড রাজশাহী অঞ্চলের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী বাঘার কালাম মোল্লার সাথে রয়েছে আসলামের সখ্যতা। এছাড়া রাজশাহী নগরীতে বেশ কয়েকটি অভিজাত ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে আসলামের বিরুদ্ধে নারীদের দিয়ে অসামাজিক কার্যকলাপ পরিচালনারও অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, বুধবার সকালে র‌্যাব-৭ কক্সবাজারের কলাতলী এলাকা থেকে রাজশাহীগামী একটি মাইক্রোবাস আটক করে। এ সময় তল্লাশি চালিয়ে তেলের ট্যাংকির ভেতর কৌশলে লুকানো অবস্থায় একলাখ আট হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়। জিঙ্গাসাবাদে র‌্যাব নিশ্চিত হয়, মাইক্রোবাসের মালিক আসলাম এবং চালক মাসুদ রানা ইয়াবা ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত। এছাড়া অন্যরা তাদের সাথে কক্সবাজারের বিভিন্ন স্পটে শুটিংয়ের জন্য আসেন। তাই আসলাম এবং মাসুৃদ রানাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে অন্যদের মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়।

আসলাম সরকার কর্মজীবনের শুরুতে একটি টেলিফোনের দোকানের সামান্য কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন। ছয় থেকে সাতটি বিয়ে করেছেন। রাজশাহীর বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে নারীঘটিত মামলাও রয়েছে। স্থানীয়দের দেয়া তথ্য মতে, ব্ল্যাক ক্যাফেতে তরুণ-তরুণীদের নিয়ে বসানো হয় মাদকসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকা-ের আসর। বাইরে থেকে সব সময় বন্ধ করে রাখা হয় এই ক্যাফেটির দরজা। বোঝার উপায় নেই, এর ভেতরে কি ঘটছে। অপরিচিত কাউকেই এই ক্যাফের মূল অংশে প্রবেশ করতে দেয়া হতো না।

পাশের ভবনেই চলে আসলামের সরকার প্রোডাকশন হাউসের কর্মকান্ড। সেখানে নারীদের মডেল হিসেবে ব্যবহার করে আসলাম সরকার মাদকের পাশাপাশি অপরাধ জগতের স্বর্গ গড়ে তোলেন। সুন্দরী নারী মডেলদের ব্যবহার করে বিত্তশালী পরিবারের ছেলেদের নিয়ে গিয়ে ইয়াবায় আসক্ত করান এই আসলাম সরকার। আর এভাবেই আসলাম রাজশাহী নগরীতে বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল বাড়ি বানিয়েছেন। কিনেছেন দামি প্লট। ঘোরেন অত্যাধুনিক মডেলের গাড়িতে। এখন তিনি শতকোটি টাকার মালিক।

আসলামকে গ্রেপ্তারের পর র‌্যাব-৭ কক্সবাজারের কোম্পানি কমান্ডার মেজর রুহুল আমিন বলেন, আসলাম সরকার বহুদিন থেকে মিউজিক ভিডিও শুটিংয়ের নামে কক্সবাজার থেকে ইয়াবা নিয়ে গিয়ে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করছিলেন। আসলাম জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন, জব্দকৃত মাইক্রোবাসটি ইয়াবা পরিবহনে ব্যবহার করা হতো। জব্দ করা এক লাখ আট হাজার ইয়াবার আনুমানিক মূল্য চার কোটি ৩২ লাখ টাকা বলেও তিনি জানান।

এদিকে রাজশাহীতে অপ্রতিরোধ্য মাদক ব্যবসায়ী কালাম মোল্লার সাথে আসলাম সরকারের রয়েছে ঘনিষ্ঠতা। তারা একে অপরের সহযোগী। মাদক ব্যবসার ডন নামে খ্যাত কালামের সাথে আসলাম পরিচালনা করেন শক্তিশালী সিন্ডিকেট। কালাম মোল্লা মোস্ট ওয়ানটেড হলেও পুলিশ তাকে খুঁজে পাচ্ছে না। অথচ অভিযোগ রয়েছে, নিয়মিত আসলাম সরকারের ব্ল্যাক ক্যাফেতে যাতায়াত রয়েছে কালাম মোল্লার।

রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র সিনিয়র সহকারী কমিশনার ইফতেখায়ের আলম বলেন, কক্সবাজারে ইয়াবার বিশাল চালানসহ গ্রেপ্তারের পর আসলামের ব্যাপারে আমরা খোঁজ নিতে শুরু করেছি। সে অত্যন্ত কৌশলী আর চতুর। তার মাদক নেটওয়ার্ক এবং সম্পদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওবার পর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।

এমও-০২/২৫-০৫ (নিজস্ব প্রতিবেদক)