জুতা আবিষ্কার

প্রকাশিতঃ ফেব্রুয়ারী ১৩, ২০১৮ আপডেটঃ ১১:৩৪ অপরাহ্ন

নুরুল ইসলাম নাহিদের জন্য আমার মায়াই হচ্ছে। ৩০ বছর ধরে আমি তাঁকে চিনি। তখন তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি করতেন। পরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে এমপি হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি নানাভাবে শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের চেষ্টা করেছেন। বছরের প্রথম দিনেই রীতিমত উৎসব করে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিয়ে সারাবিশ্বেই এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছেন তিনি। তবে তাঁর সংস্কার চেষ্টার অনেকগুলোই বুমেরাং হয়েছে।

তাঁর সততা নিয়ে, আন্তরিকতা নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু তাঁর সব আন্তরিকতা, সব চেষ্টা বিফলে যেতে বসেছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ফাঁদে। তাঁর অবস্থা হয়েছে সেই সাহেবের মত, যিনি সবকিছু জানেন, কিন্তু উত্তাল নদী নৌকায় পাড়ি দিতে গেছেন সাঁতার না জেনেই। সেই সাহেবের মত নুরুল ইসলাম নাহিদের সকল চেষ্টাই ষোলো আনা মিছে হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রীকে তুলোধুনো করা হয় নিয়মিতই। গণমাধ্যমও তার বিরুদ্ধে সোচ্চার। এমনকি সংসদেও তার পদত্যাগের দাবি উঠেছে। পত্রিকায় পড়েছি, তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে পদত্যাগের ইচ্ছার কথাও জানিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তাকে কঠোরভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলার নির্দেশ দিয়েছেন।

আরও খবর : অপরাধ আমানতের খেয়ানত, ‘টাকা মেরে খাওয়া’র নয়

এই মুহুর্তে প্রশ্নপত্র ফাঁস শিক্ষার সবচেয়ে বড় সঙ্কট। তবে হেফাজতে ইসলামের দাবি মেনে পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তনের সঙ্কটটাও কম বড় নয়। এর প্রভাব হবে দীর্ঘমেয়াদী। তবু আমি কখনো শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবির সঙ্গে কণ্ঠ মিলাইনি। কারণ আমি জানি হেফাজতের দাবি মেনে নেয়ার সিদ্ধান্ত শিক্ষামন্ত্রীর নয়। আর কেউ যদি আমাকে নিশ্চয়তা দিতে পারেন, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করলেই প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ হয়ে যাবে; আমিও তার পদত্যাগ দাবি করবো।

কিন্তু আমি জানি সেটা সম্ভব নয়। সমস্যাটা ব্যক্তির নয়, সিস্টেমের। অসততা, অনৈতিকতা আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গেঁথে গেছে। একজন অভিভাবক যখন অর্থ দিয়ে সংগ্রহ করে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন তার সন্তানের হাতে তুলে দেয়, তখন ফাঁস ঠেকানো সত্যি কঠিন। তাই সিস্টেম না বদলে ব্যক্তি বদলে সমস্যার সমাধান হবে না।

নুরুল ইসলাম নাহিদ ভুলটা করেছেন শুরুতেই। প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষ যখন অল্প অল্প করে আমাদের গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে গ্রাস করছিল, তখন শিক্ষামন্ত্রী দিনের পর দিন অস্বীকার করে গেছেন। এই অস্বীকার প্রবণতা বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি। কেউ গুম হলে, পুলিশ স্রেফ বলে দেয়, আমরা কিছু জানি না। ব্যস সব দায় যেন শেষ।

শিক্ষামন্ত্রীও এই অস্বীকার প্রবণতার ফাঁদে পা দিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষকে ছড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। যখন স্বীকার করলেন, তখন পানি অনেকদূর গড়িয়ে গেছে। বোতল থেকে বের হয়ে যাওয়া দৈত্যকে এখন আবার বোতলে ঢোকানো প্রায় অসম্ভব। ফাঁস চক্রটি এখন অনেক সংগঠিত, সতর্ক। প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। প্রেসে কড়াকড়ি করেছে। পরীক্ষার আধঘণ্টা আগে পরীক্ষার্থীদের হলে প্রবেশ করতে বলেছে।

কেন্দ্রে মোবাইল ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের ধরিয়ে দিতে পারেলে ৫ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে। গোয়েন্দারা নানা অভিযান চালাচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। ফাঁসকারীরা রীতিমত সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে প্রশ্ন ফাঁস করছে। চলতি এসএসসি পরীক্ষার প্রথম ৭টি পরীক্ষাতেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে।

কর্তৃপক্ষ স্বীকার করুক আর নাই করুক; গত কয়েকবছরে দেশের প্রায় সব পাবলিক পরীক্ষা, ভর্তি পরীক্ষা, চাকরির পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে, হচ্ছে। পিইসি পরীক্ষার সুবাদে ক্লাশ ফাইভের শিক্ষার্থীও প্রশ্ন ফাঁসের বিষে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এমনকি প্রথম শ্রেণির পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবরও এসেছে পত্রিকায়। তবে এখানে একটা দারুণ বৈষম্য আছে। ফাঁস হওয়া প্রশ্ন গ্রামের শিক্ষার্থীরা পায় না। শহুরে অভিভাবকরা ফেসবুক থেকে বা পয়সা দিয়ে প্রশ্ন কিনে তুলে দেন সন্তানের হাতে।

তবে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আমার একটা প্রস্তাব আছে। পরীক্ষার ২/৩ দিন আগে সারাদেশে একযোগে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশ্ন ফাঁস করে দেয়া হোক। তখন ফাঁস হওয়া প্রশ্ন কেউ পাবে কেউ পাবে না; এই বৈষম্য দূর হবে। যে কোনো খেলা বা পরীক্ষায় লেভেলে প্লেয়িং ফিল্ড থাকাটা জরুরি। ২/৩ দিন আগে প্রশ্ন ফাঁস করে দিলে তা সবার জন্য সমান হবে। আরেকটা প্রস্তাব হলো, সবাইকে বই দেখে লিখতে দেয়া হোক। তাহলে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা যাবে। এছাড়া আর কোনো সহজ সমাধান জানা নেই আমার।

প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে সরকার শেষ চেষ্টা হিসেবে পরীক্ষার সময় সারাদেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। রোববার রাতে বিটিআরসি সবাইকে ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত ও রুটিন জানিয়ে দিয়েছিল। ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এসএসসি পরীক্ষার দিনগুলোতে সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ইন্টারনেট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিটিআরসি। মহড়া হিসেবে রোববার রাত ১০টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ইন্টারনেট বন্ধও রাখা হয়েছিল।

ইন্টারনেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত শুনে আমার খালি মনে হয়েছে, মাথা ব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার সমাধানের কথা। কারণ ইন্টারনেট মানে তো আর খালি ফেসবুক নয়। ইন্টারনেট এখন আমাদের সবার নিত্যসঙ্গী। ইন্টারনেট না থাকা মানে জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। ব্যাংক-বীমা, শেয়ারবাজার এখন ইন্টারনেট ছাড়া অচল। গার্মেন্টস ব্যবসার আান্তর্জাতিক যোগাযোগও ইন্টারনেট ছাড়া স্থবির হয়ে যায়। আউটসোর্সিং করা তরুণরা বেকার থাকে ইন্টারননেট না থাকলে। ইন্টারনেট বন্ধের কথা শুনে আমার রবীন্দ্রনাথের ‘জুতা আবিস্কতার’ কবিতার কথা মনে হয়েছে।

রাজার পায়ে ধূলা লাগে তাই ঝাড়– দিয়ে সব ধুলা পরিস্কার করার সিদ্ধান্ত হলো। কিন্তু ‘করিতে ধুলা দূর,জগৎ হল ধূলায় ভরপুর’। আমাদের তেমন একজন মুচি দরকার, যিনি জগৎ ধূলায় ভরপুর বা ‘ধুলারে মারি করিয়া দিল কাদা’ না করে রাজার পা চামড়ায় মুড়িয়ে দেবেন, যিনি সমস্যার গোড়ায় আটকাবেন। তবে যদি ইন্টারনেট বন্ধ হলেও প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ হয়ে যায়, আমার আপত্তি নেই।

রোববার রাতে ঘুমাতে গেলাম ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই তাড়াহুড়ো করে ফেসবুকে ‘শুভ সকাল’ লিখে মোবাইল রেখে পত্রিকায় মনোযোগ দেই। আইন মানা নাগরিক হিসেবে ৮টার পর আমি আর ইন্টারনেটে ঢোকার চেষ্টাই করিনি। কিন্তু আমার স্ত্রী মুক্তি দেখি গভীর মনোযোগে ফেসবুকিং করেই যাচ্ছে। জানতে চাইলাম, তোমার মোবাইলে বিশেষ ব্যবস্থায় ইন্টারনেট আছে নাকি?

সে হাসতে হাসতে জবাব দিল, মনে হয় ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্তও ফাঁস হয়ে গেছে। পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম, ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়েছে। কেনইবা সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, কেনইবা স্থগিত করা হলো, কিছুই বুঝলাম না। সিদ্ধান্তহীনতার চেয়ে ভুল সিদ্ধান্ত ভালো। একটা সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে কি এর প্রতিক্রিয়ার কথা ভাবেন না নীতিনির্ধরকরা?

রাতে বন্ধের সিদ্ধান্ত, সকালেই স্থগিত!

একেই বোধহয় তোঘলকি কারবার বলে!

এসএইচ-২৯/১৩/০২ (প্রভাষ আমিন : সাংবাদিক, কলাম লেখক; বার্তা প্রধান : এটিএন নিউজ। পরিবর্তন.কম। লেখকের নিজস্ব মতামত। এই মতামতের সাথে আমাদের কোন সম্পৃক্ততা নেই)