বিএনপির আকস্মিক ভারতপ্রীতি

প্রকাশিতঃ জুন ১৩, ২০১৮ আপডেটঃ ১১:৪৮ অপরাহ্ন

১৯৭৫-এর পর বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল সেখানে ভারত বিরোধিতা হয়ে ওঠে ১৯৭১-এর আগে পাকিস্তানি জমানার মতো। সাম্প্রদায়িকতা, প্রতিক্রিয়াশীলতার যৌথ রূপ প্রকাশ পেতে শুরু করে ভারতবিদ্বেষী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। ভারতবিরোধী এই উগ্র পাকিস্তানি রাজনীতিকে এক সাংগঠনিক রূপ দেয় জেনারেল জিয়া প্রতিষ্ঠিত বিএনপি।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ভুলিয়ে দেওয়া, আমাদের স্বাধীনতায় সবচেয়ে বড় সহায়তাদানকারী দেশ ভারত সম্পর্কে জনমনে শত্রুতা সৃষ্টির কাজটি খুব ভালোভাবে করতে সক্ষম হন জেনারেল জিয়া। তার দলে জায়গা নিতে শুরু করে দেশের স্বাধীনতাবিরোধী, মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বড় বড় মুখগুলো। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে, পত্রপত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ নিষিদ্ধ হয়, মুক্তিযুদ্ধের কথা বলা প্রায় নিষিদ্ধ করেন মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল জিয়া। আর এসব কাজকে বেগবান করতে জনমনে ভারতবিরোধী মনোভাব তৈরি করে সক্রিয় হন তারা।

বিএনপি তার প্রধান প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগকে ভারতের কাছে নতজানু বলে বরাবরই কোণঠাসা করতে চেয়েছে এবং সফল হয়েছে বারবার। ভারতবিরোধিতাই বিএনপির রাজনীতির একটি বড় উপাদান। দলটির উদ্ভব, বিকাশ, নির্বাচনি কর্মকাণ্ড, এমনকি নিত্যদিনের রাজনৈতিক বিবৃতিতে এ বিরোধিতা স্পষ্ট।

আরও খবর : খালেদা জিয়ার চিকিৎসা-হাসপাতাল-রাজনীতি: কোনটি মুখ্য?

জনশ্রুতি আছে, বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা জেনারের জিয়া, তার মৃত্যুর পর চেয়ারপারসন হওয়া বেগম খালেদা জিয়া এবং তার পুত্র তারেক রহমান যেকোনও রাজনৈতিক সমাবেশে এক ঘণ্টা বক্তৃতা দিলে এর মধ্যে আধঘণ্টা ব্যয় করতেন ভারতবিরোধিতায়। এই ধারা এখনও অব্যাহত। তো সেই দল হঠাৎ করে বলছে, তারা ভারতবিদ্বেষী নয়।

দলের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ভারত সফর করেছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে দলের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির ভারত সফর করেছেন। এর মধ্যে হুমায়ুন কবির লন্ডনভিত্তিক নেতা এবং তিনি তারেক রহমানের উপদেষ্টা হিসেবে পরিচিত। তারা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিশেষ বার্তা নিয়েই এ সফর করেছেন।

কী সেই বিশেষ বার্তা? বিএনপি আগামী নির্বাচনে ভারত সরকারের সহায়তা চায়। এ মুহূর্তে লন্ডনে থেকে ফিরেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনিও বলেছেন, বিএনপি ভারতবিরোধী রাজনীতি করবে না।

তিন প্রতিনিধি দলের সফরের মধ্যে একটা লুকোচুরি ভাব আছে। দলের অনেক সিনিয়র নেতা বলেছেন তারা এ বিষয়ে অবহিত নন। তবে জাতিকে কিছুটা অবহিত করেছেন হুমায়ুন কবির। তার কথা যেটুকু গণমাধ্যমে এসেছে, তাতে দেখা যায়, বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবীর ভারতের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক দ্য হিন্দুকে বলেছেন, ‘পেছনে না তাকিয়ে আমাদের সামনের দিকে তাকানো উচিত।

গত শতকের ৮০ ও ৯০-এর দশকের রাজনীতি এখন বাতিল হয়ে গেছে।’ ৮০ ও ৯০-এর দশকের রাজনীতিটা আসলে কী, তা আরও স্পষ্ট করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর। বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে যে খারাপ সম্পর্ক ছিল, তা ‘ভুল ও বোকামিপূর্ণ’ নীতির ফসল। পত্রিকাটিকে হুমায়ুন কবীর এও বলেছেন, ‘তারেক রহমান চান আমরা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলি।’

হুমায়ুন কবীরের এ মন্তব্য সম্পর্কে বিএনপির নেতা খন্দকার মোশাররফ বলেন, ‘তাকে আমি চিনি না। কে কোথায় কী বললো, তার ব্যাখ্যা আমি দেব না।’

রাজনীতির কারবারিরা কত কী করতে পারেন! ভারত বিদ্বেষ যে দলের বড় পুঁজি, সেই দল হঠাৎ করে ভারত শব্দটাই তার অভিধান থেকে সরিয়ে দিতে চায়। ভোটের আগে বিএনপির এই পরিবর্তিত অবস্থান যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। দলের একমাত্র ও নির্ভরযোগ্য এই দর্শনে থেকে সরে আসা, প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে এ পর্যন্ত রাজনীতির এই ভারতবিরোধী রাজনীতি ভুল ছিল বলে যেসব বক্তব্য উচ্চারিত হচ্ছে, সবই দলের ভেতরই প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে।

বিষয়টি খুব সহজ নয় আসলে। আগামী নির্বাচনে জিততে এই কৌশল। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের এসব বক্তব্য সবই নির্বাচন কেন্দ্রিক, প্রকৃত অর্থে দলের ভারতনীতিতে কোনও পরিবর্তন নয়। ২০০১-এর নির্বাচনের আগে এমন একটা কৌশল দেখা গিয়েছিল। তারপর নির্বাচনে জেতার পর যা হয়েছে তা ভারত জানে। দেশজুড়ে হিন্দু সম্প্রদায় নিধন আর হিন্দু নারী ধর্ষণের উৎসব, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্রোহীদের বাংলাদেশে আশ্রয়- প্রশ্রয় দেওয়ার ঘটনা, দশ ট্রাক অস্ত্রের চালানের মতো বিষয় সবই বহুল আলোচিত বিষয়।

তবে লন্ডন সফরে গিয়ে, বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, ‘উই উইল হ্যাভ জিরো টলারেন্স অ্যাবাউট এনি ইনসারজেন্সি ইনসাইড বাংলাদেশ। তাদেরকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। আমরা স্পষ্ট করে বলেছি তাদের কোনও অস্তিত্ব থাকবে না। স্পেস থাকবে না। এটা আমরা যদি সরকারে যাই, এটা আমরা অবশ্যই নিশ্চিত করবো’।

প্রশ্ন হলে ভারত কতটা বিশ্বাস করবে এই বক্তব্য। ২০০১-এ এমন সব প্রতিশ্রুতি ছিল। আসলে বিএনপি’র সঙ্গে যেসব রাজনৈতিক দল, যেমন জামায়াতে ইসলামীসহ অনেক ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের যে সখ্য, তারা কি বিএনপিকে থাকতে দেবে এই জায়গায়? কিংবা বিএনপি নিজেও কি অন্তরে এমন সদ্ভাব আসলে প্রত্যাশা করে? হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার সমঝে চললেও তাদের আসল সখ্য বিএনপির সঙ্গেই।

এ এক নতুন কৌশল। শুধু ভারতবিরোধিতা দিয়ে ভোটের কিস্তিমাৎ করা যাবে না, এমন একটা ভাবনা এসেছে। তিস্তা চুক্তি রূপায়ণে ব্যর্থতা নির্বাচনি প্রচারে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় করে তুলবে দলটি।

ভারতের সঙ্গে নিবিড় বাণিজ্য ও অন্যান্য অবকাঠামোগত যোগাযোগের ব্যাপারেও বরাবর নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। আওয়ামী লীগ সরকারে থাকলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যেকোনও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছে বিএনপি। বিএনপি মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিকে ‘দাসত্বের চুক্তি’ বলে বারবার সমালোচনা করে এসেছে। এই সীমান্ত সমস্যা সমাধান হয়েছে শেখ হাসিনার বর্তমান আমলে। ১৯৯১’র নির্বাচনের আগে বেগম জিয়া প্রকাশ্যে বলেছেন, নির্বাচন আওয়ামী লীগ জিতলে মসজিদে আজানের পরিবর্তে উলুধ্বনি শোনা যাবে।

১৯৯৭ সালে স্বাক্ষর হওয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে বিএনপি। খালেদা জিয়া তখন বলেছিলেন, পার্বত্য চুক্তি হলে ফেনী পর্যন্ত দেশের এক-দশমাংশ ভারতের অংশ হয়ে যাবে। ২০১৩ সালের মার্চ মাসে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশে এলে আগে থেকে নির্ধারিত সৌজন্য সাক্ষাতে যাননি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এমনকি সেদিন হরতাল ডাকা হয়েছিল, প্রণব মুখার্জির অবস্থান করা সোনারগাঁও হোটেলের সামনে ককটেলও ফুটেছিল। এমন কট্টর সাম্প্রদায়িক ও ভারতবিদ্বেষী আচরণ নিশ্চয়ই ভারতের মনে আছে, থাকবে।

বিএনপি কি আসলেই ভারতবিরোধী অবস্থান পাল্টাচ্ছে, নাকি সামনে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখেই ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের কথা বলছে, সে এক বড় জিজ্ঞাসা। একেবারে সাম্প্রতিক সময়েও তাদের একাধিক নেতা তাদের ভারতবিরোধী চিরাচরিত অবস্থানের আদলেই কথা বলেছেন।

গত ২৭ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর নিয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘সরকারি অর্থ ব্যয় করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে ভারতের কাছে আকুতি জানাতে ওই সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী। গণমাধ্যমের খবরে এটা পরিষ্কার, প্রধানমন্ত্রী দেশের স্বার্থে ভারতে যাননি, তিনি তিস্তার পানিচুক্তি, সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে যাননি। তিনি ভারতে গেছেন ক্ষমতায় টিকে থাকতে দেনদরবার করার জন্য।’

দিল্লি কী চায় সেটাই আসল। নয়াদিল্লি চায় ঢাকায় এমন সরকার ক্ষমতায় থাকুক, যারা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদ, ইসলামি সন্ত্রাসবাদ ও আন্তঃসীমান্ত সংযোগ ইস্যুতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে শেখ হাসিনার অবদান ভারত কোনোদিন ভুলবে না।

এসএইচ-২৭/১৩/০৬ (সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, লেখক: এডিটর-ইন-চিফ, জিটিভি ও সারাবাংলা। বাংলা ট্রিবিউন। লেখকের নিজস্ব মতামত। এই মতামতের সাথে আমাদের কোন সম্পৃক্ততা নেই)