এক রনি শ্রীঘরে, লক্ষ রনি ঘরে ঘরে

প্রকাশিতঃ জুন ১৫, ২০১৮ আপডেটঃ ৪:০৪ অপরাহ্ন

সম্প্রতি প্রাইভেট কারে তরুণীকে ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত রনি হকের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসের স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। মাস দুয়েক আগে লেখা এই স্ট্যাটাসে রনি ইসলাম ধর্মের পর্দাপ্রথার বিধানের উপকারিতা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন।

রনি মনে করেন পর্দাপ্রথা তিনভাবে মানবজাতিকে উপকৃত করে। ‘প্রথমত, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের নৈতিক চরিত্রের ‘হেফাজত’ করে। দ্বিতীয়ত, নারী-পুরুষের জন্য আলাদা কর্মক্ষেত্র নির্ধারনের মাধ্যমে নারীদের উপর ন্যস্ত গুরুদায়িত্ব নির্বিঘ্নে ও সুষ্ঠুভাবে পালনের নিশ্চয়তা দেয়। তৃতীয়ত, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পরকীয়াবিহীন পবিত্র সম্পর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে চরিত্রহীনতা ও অবিশ্বাস দূর করে, পারিবারিক সম্পর্ককে সুদৃঢ় করে’।

কথাগুলো শুনতে বেশ ভালো, দেশের বেশিরভাগ লোকই রনির সাথে সহমত পোষণ করবেন। আমার প্রশ্ন হলো, পর্দাপ্রথায় গভীর বিশ্বাসী রনি হক নিজে কেন পারলেন না নারীর সাথে অবাধ মেলামেশা থেকে বিরত থাকতে? বরং অবাধ মেলামেশা থেকেও কয়েক কাঠি উপরে গিয়ে নিরাপদে নিজ ঠিকানায় পৌঁছে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাস্তা থেকে একজন নারীকে তুলে এনে বলপূর্বক যৌন লালসা চরিতার্থ করতে দ্বিধা করলেন না। নাকি তিনি বিশ্বাস করেন রাস্তায় বেরোনো বেপর্দা নারীর উপর বলপ্রয়োগ পর্দাপ্রথার দ্বারা সমর্থিত?

আরও খবর : ‘দুই পাগলের হলো মেলা’

জানা গেছে রনি হকের একজন স্ত্রী এবং দুটি সন্তানও রয়েছে। পর্দাপ্রথার প্রতি গভীর বিশ্বাস তার নিজের নৈতিক চরিত্র ‘হেফাজত’ করতে অথবা চরিত্রহীনতা ও অবিশ্বাস দূর করে স্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে খুব একটা সাহায্য করতে পেরেছে বলে মনে হচ্ছে না।

ধর্ষণ এবং পোশাকের মধ্যে চিরদিনই যোগসূত্রতা খুঁজে আসছেন তথাকথিত ধার্মিকেরা। হিজাব/বোরখা পরা মেয়েদের ধর্ষিত হবার বহু খবর এসেছে পত্রিকায়। আমরা এ নিয়ে নিরন্তর যুক্তিপূর্ণভাবে লেখালেখি করে যাচ্ছি। তার পরও তাদের মুখ বন্ধ হয়নি। মসজিদ মাদ্রাসায় ধর্মশিক্ষকদের হাতে শিশুদের ধর্ষণ, পিতার হাতে কন্যার ধর্ষণ, চার/পাঁচ মাসের শিশুর ধর্ষণও তাদেরকে নিরব করতে পারেনি।

কেন জানেন? সত্যি কথা হচ্ছে তারা নিজেরাও জানেন পর্দার সাথে ধর্ষণের কোনো সম্পর্ক নেই। ইচ্ছে করে চোখ বন্ধ করে রাখা লোকদের অন্ধত্ব ঘোচানো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চোখের ডাক্তারেরও কর্ম নয়। আমরা তো কোন ছার!

আমি বিভিন্ন দেশে পর্দানশীন মেয়েদেরকে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে দেখেছি, আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণও নিতে দেখেছি। আমস্টার্ডামে মুসলিম নারীরা বোরখা হিজাব পরেই সাইকেল চালিয়ে নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়ান। সেক্ষেত্রে পর্দা করার বিষয়টা তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত থেকে এসেছে বলেই পর্দা তাদেরকে ভীরু বা দুর্বল করে তোলেনি। এখানে স্বাধীনতা আগে এবং পর্দা পরে অথবা দুটোই একসাথে এসেছে। এতে আমি কোনো দোষ দেখি না। একটা মেয়ে যদি বিশেষ কোনো ধর্মের বিধান নিজ ইচ্ছায় মেনে নিতে চায়, পর্দা করতে চায় সেটা তার ব্যাপার।

কিন্তু রনি হক পার্টির নারীর উপর পর্দাপ্রথা চাপিয়ে দেয়ার বিষয়টি এর ঠিক উল্টো, নারীর স্বাধীনতাকে খর্ব করে পর্দার আড়ালে রেখে ভোগের সামগ্রী বানানোই তাদের উদ্দেশ্য। যারা পোশাককে ধর্ষণের কারণ অথবা নৈতিকতার রক্ষাকবচ হিসেবে চিহ্নিত করতে চায় তারা নিজেরাই ধর্ষকামী অথবা পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাধারার বেকুব সমর্থক। নারীকে পর্দার অন্তরালে রেখে দুর্বল করে তোলাই তাদের অভিপ্রায়।

যে নারী ঘর থেকে বের হয় না, অবাধে চলাফেরা করা শেখে না তাকে কাবু করা অনেক সহজ। পুরুষের সাথে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যে নারী সে পুরুষকে বুঝতে শেখে, পুরুষের কামনার ছোবল থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারার সাহস এবং আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হয়। পক্ষান্তরে পর্দার আড়ালে সযত্নে লালিত নারী কোনো না কোনো পুরুষের নিয়ন্ত্রাধীণ অবস্থায় জীবন কাটায়। নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিতে অক্ষম একজন নারী নিজের শরীরের নিয়ন্ত্রণ নেবে কীভাবে?

সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাপার হলো বেশিরভাগ নারীরা নিজেদের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত এই চক্রান্তে আস্থা রেখেই বেড়ে উঠেন, এই চক্রান্তের বিষবৃক্ষে পানি ঢেলে একে বাড়িয়ে তোলেন এবং নিজেদের জন্যই বিপদ ডেকে আনেন।

রনি হককে রাজপথে ‘বেপর্দা’ করে গণধোলাই দিয়েছেন যেসব বীরপুরুষেরা, খোঁজ নিয়ে দেখুন তাদের বেশিরভাগই পর্দাপ্রথায় বিশ্বাসী। শুধু বিশ্বাসী নন, নারীকে জোর করে ক্রিসমাস গিফটের মত র‍্যাপিং পেপার দিয়ে মুড়ে রাখতে পারলেই সুখী হবেন তারা। রনি হককে গাড়ির কাঁচের স্বচ্ছ ‘পর্দা’র আড়ালে জবরদস্তিমূলক যৌনকর্মে হাতেনাতে ধরার আগে ইনার উপরোক্ত স্ট্যাটাসটা পড়লে হয়ত প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতেন তারা। হয়তো বা তাকে পীরও মেনে বসতেন, বিচিত্র নয়। এক রনিকে বাগে পেয়ে জেলে পুরে উল্লাস করার কিছু নেই, যেখানে ঘরে ঘরে লক্ষ রনি মজুদ রয়েছেন।

তবে আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে রনি হকের একটা ধন্যবাদ পাওনা রইল। পর্দাপ্রথায় বিশ্বাসী ধর্ষকামী এই মহান পুরুষ ঢাকার রাজপথে সন্দেহাতীতভাবে আমার মত গরিবের বাসি কথাকে সত্য বলে প্রমাণ করলেন, ‘’ধর্ষণের সাথে পর্দার কোনো সম্পর্ক নাই, ধর্ষকামীদের মানসিকতার সাথে ইহার পরিপূর্ণ সম্পর্ক রহিয়াছে’।

এসএইচ-২৯/১৫/০৬ (জেসমিন চৌধুরী : অভিবাসী শিক্ষক, লেখক ও অনুবাদক; ম্যানচেস্টার, ইউকে। পরিবর্তন। লেখকের নিজস্ব মতামত। এই মতামতের সাথে আমাদের কোন সম্পৃক্ততা নেই)