রাজশাহীতে মেডিকেল প্রতিবেদনে আটকে আছে ১১০ মামলা!

প্রকাশিতঃ নভেম্বর ৮, ২০১৮ আপডেটঃ ৫:২৩ অপরাহ্ন

মেডিকেল প্রতিবেদন না পাওয়ায় থমকে আছে রাজশাহীর ১১০টি চাঞ্চল্যকর ও হত্যা মামলার বিচারকাজ। বার বার কেবল তারিখ পেছাচ্ছে। এতে ভোগান্তিতে বাড়ছে বিচার প্রার্থীদের।

গত ২৮ অক্টোবর রাজশাহীর চীফ জুডিশিয়াল আদালতের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসি সম্মেলনে এনিয়ে কথা হয়। সেখানে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, বার বার ধর্না দিয়েও ময়নাতদন্ত বা ভিসেরা প্রতিবেদন মিলছেনা।

এনিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের (রামেক) ফরেনসিক বিভাগের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ আনেন পুলিশ কর্তারা। তবে জনবল না থাকায় সময়মত প্রতিবেদন দেয়া যাচ্ছেনা বলে জানিয়েছে রামেক কর্তৃপক্ষ।

ওই সম্মেলনে বিচারকরা জানান, চাঞ্চল্যকর ও হত্যা মামলার বিচারকাজ বাধাগ্রস্থ হবার প্রধান কারণ ময়নাতদন্ত বা ভিসেরা প্রতিবেদন না পাওয়া। তাছাড়া অনেক হত্যা মামলায় নথিতে নেই পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদন। ফলে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে মামলার বিচারকাজ।

এদিকে, রামেক ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মারাত্মক জনবল সংকটে রয়েছে বিভাগটি। সর্বশেষ অধ্যাপক হিসেবে বিভাগ ছেড়ে গেছেন ডা. যোবাইদুর রহমান। ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবর তিনি অবসরে যাবার পর থেকেই পদটি শূণ্য। বর্তমানে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বপালন করছেন কলেজের মাইক্রোবায়োলজী বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. শাহ্ আলম। তিনিও আসেননা নিয়মিত।

তিন প্রভাষকের একটি পদ ফাঁকা দীর্ঘদিন ধরেই। একমাত্র মেডিকেল অফিসারের পদটিও ফাঁকা। এখানকার প্রভাষক ডা.এনামুল অবসরে গেছেন গত ৫ আগস্ট। যে সব মেডিকেল প্রতিবেদন ঝুলে আছে তার মধ্যে অন্তত: ৬০টি পরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন ডা. এনামুল।

খণ্ডকালীন অধ্যাপক দিয়ে এখানকার একাডেমিক কার্যক্রম চললেও ময়নাতদন্ত করছেন দুই প্রভাষক ও শিক্ষার্থীরা মিলে। ফলে গত এক বছরে অন্তত: শতাধিক মামলার মেডিকেল প্রতিবেদন দিতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে, রাজশাহীর আদালত সূত্র জানিয়েছে, চাঞ্চল্যকর ১১০ মামলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা রয়েছে চারঘাটে- ৩৯টি। এছাড়া বাগমারা ও দুর্গাপুর থানার ১৫টি, গোদাগাড়ী ও তানোরের ৩০টি, বাঘা ও পুঠিয়ার ১৯টি, পবা ও মোহনপুরের ৭টি। এসব মামলায় মেডিকেল প্রতিবেদন উপস্থাপিত হয়নি আদালতে।

এবিষয়ে রাজশাহীর পুলিশ সুপার মো. শামসুদ্দিন জানান, রামেক ফরেনসিক বিভাগ থেকে ময়নাতদন্ত বা ভিসেরা প্রতিবেদন সময়মত পাওয়া যাচ্ছেনা। ফলে তদন্তকারী কর্মকর্তারা সেটি আদালতে দাখিল করতে পারছেন না। এতে মামলার অগ্রগতি থমকে যাচ্ছে।

তিনি অভিযোগ করেন, রামেক ফরেনসিক মেডিসন বিভাগের গাফেলতিতেই এমনটি হচ্ছে। এতে পুলিশের কোন দায় নেই। হত্যা মামলার নথিতে সুরতহাল প্রতিবেদন দাখিল না করার বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথাও জানান পুলিশ সুপার।

তবে গাফেলতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. নওশাদ আলী। তিনি বলেন, এখন ময়নাতদন্ত করার মতই পর্যাপ্ত লোকবল আমাদের নেই। কখনো কখনো শিক্ষার্থীদের দিয়েই ময়নাতদন্ত করতে হচ্ছে। ফলে প্রতিবেদন দেয়া যাচ্ছেনা সময়মত।

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপিত না হওয়ায় ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা কঠিন বলে জানিয়েছেন রাজশাহীর জেলা ও দায়রা জজ মীর শফিকুল আলম। তিনি বলেন, আদালতে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না দাখিল হলে বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হবে। এতে বিচার প্রার্থীরা ক্ষতিগ্রস্থ হবেন।

উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, ফরেনসিক প্রতিবেদন, বা মেডিকেল প্রতিবেদন বা ভিসেরা প্রতিবেদন থাকলে সাক্ষি না আসলেও সেটি আমলে নিয়ে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা যায়।

এদিকে, রাজশাহীর আদালতগুলোয় মামলার তথ্য বিন্যাসে দেখা গেছে, ৫টি আমলী আদালতে বিচারাধীন দুই হাজার ৮১টি সিআর এবং এক হাজার ৯৪৩টি জিআর মামলা। এর মধ্যে আমলী আদালত -১ (পবা-মোহনপুর) এ ৪৬২, আমলী আদালত -২ (বাঘা-পুঠিয়া) এ ৮৬৩, আমলী আদালত -৩ (গোদাগাড়ী-তানোর) এক হাজার ২৯৪, আমলী আদালত -৪ (বাগামার-দুর্গাপুর) এ ৮৭৩ এবং আমলী আদালত -৫ (চারঘাট) এ ৫৩২টি মামলা বিচারাধীন।

বিচারাধীন এসব মামলার ৬৫১টি সিআর এবং এক হাজার ২০৬টি জিআর মামলার তদন্ত চলছে। এর মধ্যে ২৪৩টি মামলা থানা পুলিশ, ১৩৩টি মামলা পিবিআই এবং বাকি ২৭৫টি মামলা অন্যান্য তদন্তকারী সংস্থা তদন্ত করছে।

এক বছরের বেশি সময় ধরে তদন্ত চলছে ১৩১টি জিআর এবং ৬৫টি সিআর মামলা। সর্বোচ্চ ২৯টি জিআর মামলা তদন্তাধীন জেলার পুঠিয়া থানায়। এছাড়া গোদাগাড়ীতে ২৮টি, পিবিআই ২৪টি, তানোর ১৮টি, দুর্গাপুর ১৩টি এবং বাঘায় ১০টি পবায় ৯টি এবং বাগমারায় ৫টি মামলা তদন্তাধীন।

অন্যদিকে, সিআর মামলার ২০টি তদন্তাধীন পিবিআইয়ের অধীনে। বাকিগুলোর ২৬টি গোদাগাড়ী, ১০টি তানোর তিনটি দুর্গাপুর, দুটি করে বাগমারা, পুঠিয়া ও বাঘা এবং একটি করে চারঞাট ও মোহনপুরে।

গত নয় মাসে মোট মামলা দায়ের করেছে দুই হাজার ৩৮৭টি। কোর্ট পিটিশন এফআইআর হয়েছে ২০৮টি। ৯০৩ মামলায় অভিযোগপত্র এবং ৫৭টি মামলায় চুড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। চুড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ হয়েছে ২৬টি মামলায়। আর নিস্পত্তি হয়েছে মোট ২৯ মামলা।

২০০৭ সালের নভেম্বর থেকে এবছরের সেপ্টম্বর পর্যন্ত ১১ বছরে মোট মামলা হয়েছে ৮৫ হাজার ৩৫৩টি। এসময় নিস্পত্তি হয়েছে ৮৮ হাজার ৪৯১টি মামলা। ২০০৭ সালে মামলার জের ছিলো ৭ হাজার ৯৮৭টি। এবছরের সেপ্টেম্বরে তা দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৩৬৮ তে।

কেবল এ বছরের জানুয়ারী থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে ১৪২ জনকে সাজা এবং খালাস ৪৭২ জনকে খালাস দিয়েছেন আদালত।

অন্যদিকে, এক হাজার ৯৪৩টি জিআর মামলার মধ্যে এক হাজার ১৩৫টি মামলা তদন্তাধীন। অধিকতর তদন্ত চলছে ৭১ মামলার। রিপোর্ট পর্যালোচনায় আছে ৪৮২ মামলার। এছাড়া নারাজি দেয়া হয়েছে ২৮ মামলার। অন্যদিকে দুই হাজার ৮১ টি সিআর মামলার মধ্যে অধিকতর তদন্ত চলছে ৬৫১ মামলার। ১০৭ টি মামলায় নারাজি দাখিল করা হয়েছে।

বিএ-১৩/০৮-১১ (নিজস্ব প্রতিবেদক)