পানি সঙ্কটের সম্মুক্ষিন রাজশাহী অঞ্চল

প্রকাশিতঃ মে ১৬, ২০১৮ আপডেটঃ ৩:৪৩ অপরাহ্ন

ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারনে ক্রমশই রাজশাহী অঞ্চল পানি শূণ্য হয়ে পড়ছে। ক্রমশই হারিয়ে যাচ্ছে পানির আধার। বিশেষ করে খরা মওসুমে বিভিন্ন এলাকায় দেখা দেয় পানি সংকট। যত দিন গড়াচ্ছে এ সংকট আরো প্রকট হয়ে উঠছে। ফারাক্কার কারনে এ অঞ্চলে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে সেই ব্যাপারে প্রতিবাদের ঝড় উঠে সেই ১৯৭৬ সালের ১৬ মে। সেই দিন থেকে প্রতি বছর এ অঞ্চলে ফারাক্কা দিবস পালন হয়ে আসছে।

বাঁধ নির্মানের পর সত্তর দশকের শেষের দিক থেকে বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলসহ ভারতের পশ্চিম বঙ্গের লালগোলা, মালদহসহ পাশ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকায় নদী ভাঙ্গন শুরু হয়। প্রথম দিকে বিষয়টি তেমন ভাবে আমলে না নেয়ায় আজ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে ভুক্তভোগিদের অভিযোগ। বিষয়টি নিয়ে ভারতেও চলছে দীর্ঘদিন থেকে আন্দোলন সংগ্রাম। কিন্ত এখনও তেমন কোন কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহন করেনি সরকার। ফলে নদী ভাঙ্গন অব্যাহত থাকায় ভূমিহীনের সংখ্যা বাড়ছে।

আরও খবর : তিস্তা চুক্তি না হওয়া নিয়ে সংশয় : থাকছেন না মমতা

এ ঘটনা কলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। ২০০৮ সালের ৩০ মার্চ আদালতের চার জন বিচারপতি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে জিজ্ঞাসাবাদেরও নির্দেশ দিয়েছিল। আর তা তদন্তের জন্য কলকাতা হাইকোর্ট ৪জন বিচারপতিকে মালদহ পাঠান তদন্তের মাধ্যমে গনশুনানির জন্য। ২০০৬ সালের ২৩ নভেম্বর হাইকোর্টের নির্দেশে জর্জকোর্ট একটি গণশুনানী করেছিল। সেখানে দেখা হয়েছিল আসলে নদী ভাঙ্গনে এলাকার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিনা। এর পর হাইকোর্ট থেকে ফরম দেয়া হয় ক্ষতিগ্রস্তদের পূর্ন ডাটা দেবার জন্য। এত কিছুর পরেও ফারাক্কা নিয়ে কোন স্থায়ী সমাধান হয়নি এখনও। যার কারনে বছরের পর বছর মানুষ ক্ষতির সম্মুক্ষিন হচ্ছে।

ফারাক্কা বাঁধের কারনে বাংলাদেশে পানি শূন্যতার কারনে এক চতুর্থাংশ উর্বর কৃষিজমি চাষাবাদের অনুপযোগি হয়ে পড়ছে। তিন কোটি মানুষের জীবনে পরিবেশগত বিপর্যয় নেমে আসে। কৃষি, মৎস, সেচ ও শিল্পখাতে আনুমানিক বছরে বাংলাদেশের ক্ষতি হচ্ছে ৫০কোটি ডলার।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ফারাক্কা বাঁধ গঙ্গা নদীর উপর অবস্থিত একটি বাঁধ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায় এই বাঁধটি অব¯ি’ত। ১৯৬১ সালে এই বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। শেষ হয় ১৯৭৫ সালে। সেই বছর ২১ এপ্রিল থেকে বাঁধ চালু হয়। ফারাক্কা বাঁধ ২ হজার ২৪০ মিটার (৭ হাজার ৩৫০ ফুট) লম্বা। যেটা প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে সোভিয়েত রাশিয়ার সহায়তায় বানানো হয়েছিল। বাঁধ থেকে ভাগীরথী-হুগলি নদী পর্যন্ত ফিডার খালটির দৈর্ঘ্য ২৫ মাইল (৪০ কি:মি:)।

ফারাক্কা বাঁধ ভারত তৈরি করে কলকাতা বন্দরকে পলি জমা থেকে রক্ষা করার জন্য। তৎকালীন বিভিন্ন সমীক্ষায় বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেন যে গঙ্গা/পদ্মার মত বিশাল নদীর গতি বাঁধ দিয়ে বিঘিœত করলে নদীর উজান এবং ভাটি উভয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হতে পারে। এ ধরণের নেতিবাচক অভিমত সত্ত্বেও ভারত সরকার ফারাক্কায় গঙ্গার উপর বাঁধ নির্মাণ ও হুগলী-ভাগরথীতে সংযোগ দেয়ার জন্য ফিডার খাল খননের কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে যা মূলত বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার রাজ্যে ব্যাপক পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে আনে। এটি প্রায় ১৮ কি.মি লম্বা এবং মনহরপুরে অবস্থিত।

১৬ মে সেই ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস। ১৯৭৬ সালে এই দিনে মরনফাঁদ ফারাক্কা ভেঙ্গে দাও, গুড়িয়ে দাও শ্লোগানের মাধ্যমে মরহুম মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ডাকে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের লাখো মানুষ সেদিন জড়ো হয়েছিলেন রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দানে। জনসভা শেষে ভারতের ফারাক্কা অভিমুখে লং মার্চ আন্তর্জাতিক বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। এর পরেও আজও এর সুষ্ঠু সমাধান হয়নি। বরং ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে আজ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় পানির আধার কমে যাচ্ছে।

দিনটি ছিল ১৬মে রোববার। দেশের মানুষ পায়ে হাটার কষ্ট, রাত যাপন আর খাবার সমস্যাকে স্বীকার করেই মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে এই দীর্ঘ পদযাত্রাকে মেনে নেয় সকলে হাসিমুখে। বিভিন্ন স্থানে যাত্রা বিরতী কালে খারারের সম্বল বলতে ছিল কোথাও চিড়া-মুড়ি, আর কোথাও সামান্য গুড়-পানি। খিচুড়ি ছিল দুপুরের একমাত্র খাবার। তাও উপচে পড়া ভীড়ের কারণে সে খাবার পাওয়া থেকেও বঞ্চিত হয়েছিল কেউ কেউ।
তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, এই লংমার্চ আরম্ভের পূর্বে মাওলানা ভাসানি মাদ্রাসা ময়দানে সকাল ১০ টা ১৫ মিনিটে মঞ্চে উপস্থিত হন। জনসমুদ্রে বক্তব্য রাখেন ১০ মিনিট।

তার এই বক্তব্য কেবল জ্বালাময়ী ছিল না, তাতে ছিল দিক নির্দেশনাও। বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন আমরা আপোষে ফারাক্কা সমস্যার সমাধানে আগ্রহী। ভারত যদি আমাদের শান্তিপূর্ণ প্রস্তাবে সাড়া না দেয় বিশ্বের শান্তিকামী জনগনও ভারতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করবে। বক্তৃতা শেষে তিনি মিছিলের পুরোভাগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এ সময় তার সহচর হিসেবে ছিলেন মরহুম মশিউর রহমান যাদু মিয়া, কাজী জাফর আহমদ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।

লং মার্চের মিছিলটি রাজশাহী কোর্ট পৌছানো মাত্র শুরু হয় ধুলিঝড় আর মুষুলধারে শিলাবৃষ্টি। দুপুর ২টা মিছিলটি ১৮ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে মধ্যহ্ন বিরতী করে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর প্রেমতলীতে। সন্ধ্যা ৬ টায় মিছিল পৌঁছায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে। নবাবগঞ্জ সরকারী কলেজ মাঠে সমবেত জনতা বিশ্রাম নেয়। এ সময় জনতার উদ্যেশ্যে ভাসানী ঘোষণা করেন ভারত ফারাক্কা সমস্যার সমাধান না করলে তিনি ভারতীয় পণ্য বর্জনের আন্দোলন শুরু করবেন। ফারাক্কা বাংলাদেশের জন্য অভিশাপ বলে জনতাকে জানান, এ বছর প্রায় ৩ শ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে স্বচক্ষে ফারাক্কা বাঁধের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের দুরাবস্থা দেখারও আহবান জানান। রাত্রী যাপন করেন এখানেই।

পরদিন ১৭ মে সোমবার সকাল ৮ টায় লংমার্চ পুনরায় যাত্রা শুরু করে। মহানন্দা নদী পাড়ি দেবার জন্য নৌকা দিয়ে তৈরী করা হয়েছিল সেতু। বর্তমানে যেখানে বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতু রয়েছে। নদী পার হয়ে শিবগঞ্জ অতিক্রম করে বিকেল সোয়া ৪টায় মিছিল পৌছায় কানসাট গ্রামে। কানসাট হাই স্কুল মাঠে বিশাল জনসভায় সমাপনী ভাষন দেন তিনি। এই লং মার্চের ঐতিহাসিক ঘটনার ৬মাস পরেই মাওলানা ভাসানী ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর মার যান।

নদী বাঁচাও, পরিবেশ বাচাঁও আন্দোলন ও ফারাক্কা লং মার্চ উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক এ্যাড. এনামুল হক বলেন, ভারত আন্তজার্তিক নদী গঙ্গার ১৭টি পয়েন্টে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। যার কারনে রাজশাহী অঞ্চলের নদী-খাল-বিলে পানি শূণ্যতা দেখা দিয়েছে। এখনও শুস্ক মওসুম শুরু হয়নি। অথচ ইতমধ্যে পদ্মা নদী শুকিয়ে বালির চর পড়েছে।

রাজশাহী রক্ষা সংগ্রম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খাঁন বলেন, ফারাক্কা বাঁধের কারনে রাজশাহী আজ ক্রমশই মরুভূমিতে পরিনত হতে যাচ্ছে। ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন সময় দাবি তোলা হচ্ছে। যাতে করে সরকার সেই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহন করেন। কিন্ত হচ্ছে না। যার কারনে শুস্ক মওসুম শুরু হলেই রাজশাহী অঞ্চলে পানি সঙ্কট দেখা দিচ্ছে।

এসএইচ-০৬/১৬/০৫ (সুমন হাসান)