পলাতক ও নতুন জঙ্গি সদস্যদের বিষয়ে সতর্ক নজরদারি শুরু

প্রকাশিতঃ জুন ১৫, ২০১৮ আপডেটঃ ১২:৪৭ অপরাহ্ন

পলাতক ও নতুন সংগঠিত জঙ্গিদের বিষয়ে নতুন করে সতর্ক নজরদারি শুরু করেছে দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। সাম্প্রতিক সময়ে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (পুরনো জেএমবি), নব্য জেএমবি ও আনসার আল ইসলামের জঙ্গিদের নতুনভাবে সংগঠিত হওয়ার নমুনা পেয়েছে গোয়েন্দারা। বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত নাশকতার পরিকল্পনা করছে এসব জঙ্গি। এ জন্য গোপনে নতুন সদস্য সংগ্রহ, তহবিল সংগ্রহ, প্রচারণা ও টার্গেট নির্ধারণের কাজ করছে তারা। বগুড়া, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকায় গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গিদের কাছ থেকে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার তথ্য মিলেছে।

গত সোমবার মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে মুক্তমনা লেখক, প্রকাশক ও সাবেক সিপিবি নেতা শাহজাহান বাচ্চু হত্যা এবং কয়েকটি ডাকাতি-ছিনতাইয়ের ঘটনায়ও মিলেছে যোগসূত্র। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, জঙ্গিদের নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য পেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত মাসে অধীনস্থ আইন-শৃঙ্খলা সংস্থাগুলোকে জানিয়েছে। আর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পুলিশের ওপর হামলা মোকাবেলায় সতর্ক পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে দেশে সুনির্দিষ্ট জঙ্গি হামলার আশঙ্কা না থাকলেও জঙ্গিরা ফের পুনঃসংগঠিত হতে চাইছে। এ কারণে সব ধরনের সতর্ক নজরদারি রাখা হচ্ছে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম গতকাল বৃহস্পতিবার কে বলেন, ‘জঙ্গিরা সব সময়ই পুনঃসংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে। সেভাবেই এখন সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। তারা যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে সে জন্য আমরা সতর্ক আছি।’ নব্য জেএমবি ও আনসার আল ইসলামের হুমকি আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের সাংগঠনিক শক্তি নেই। অভিযানে অনেক নেতা ধরা পড়েছে, মারা গেছে।

আরও খবর : নির্বাচনী ঈদ করতে মন্ত্রীরা ছুটছেন গ্রামে

তবে বারবার নেতা পরিবর্তন করত তারা। বড়দের অনুপস্থিতিতে ছোটরা নেতৃত্বে চলে আসছে। নতুনরাই আবার নতুন সদস্য ও অর্থ কালেকশন করার চেষ্টাও করে। সাম্প্রতিক হামলা ও আশঙ্কা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মুন্সীগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকায় যে ঘটনা ঘটেছে সেখানে বড় ধরনের প্রস্তুতির দরকার ছিল না। শাহজাহান বাচ্চুও আমাদের কোনো তথ্য দেননি। ফলে এমন ঘটনার জন্য সবাইকে সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে।

আর বিশ্বের জঙ্গি হামলা, যেমন—সম্প্রতি বেলজিয়ামে হয়েছে। এসব প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সুনির্দিষ্ট কোনো হামলার আশঙ্কা নেই।’ নব্য জেএমবির নারী শাখার প্রধান হুমায়রা ওরফে নাবিলা জামিনে ছাড়া পেয়েছে। এ ধরনের জঙ্গিদের ওপর নজরদারি আছে কি না জানতে চাইলে মনিরুল বলেন, ‘আমরা খোঁজ রাখছি। যেন বিদেশে যেতে না পারে সে ব্যাপারে বার্তা দেওয়া আছে।’

পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, গত মাসের মাঝামাঝিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে জঙ্গিদের বিষয়ে সতর্ক করা হয়। এতে বলা হয়, জঙ্গিরা আবারও সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে বলে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রতিটি জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) এবং ইউনিটকে জঙ্গি নাশকতার ব্যাপারে সতর্ক থাকার বার্তা দেওয়া হয়।

এতে বলা হয়, জঙ্গিদের পরবর্তী টার্গেটের মধ্যে পুলিশ ও পুলিশের স্থাপনা রয়েছে। এ কারণে সতর্ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। এসব নির্দেশনার পর পুলিশ সতর্কতা বাড়িয়েছে। চলমান মাদকবিরোধী অভিযানের মধ্যে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়াসহ কয়েকটি জেলায় অভিযান চালিয়ে জেএমবি, নব্য জেএমবি ও আনসার আল ইসলামের বেশ কিছু জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ও র‌্যাব।

সিটিটিসি সূত্র জানায়, গত সোমবার মুন্সীগঞ্জে সিরাজদিখানের পূর্ব কাকালদী গ্রামে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন ব্লগার, মুক্তমনা লেখক, প্রকাশক ও সাবেক সিপিবি নেতা শাহজাহান বাচ্চু। দুই মোটরসাইকেলে এসে চারজন তাঁকে হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ডের আলামত এবং আগে হুমকির কারণে ঘটনাটি আনসার আল ইসলামের জঙ্গিরা ঘটিয়েছে বলেই ধারণা তদন্তকারীদের। আর বর্তমানে জঙ্গিরা তহবিল সংগ্রহে ডাকাতি-ছিনতাই করছে। সম্প্রতি ঢাকা, রাজশাহী ও গাজীপুরে অন্তত ১৫টি ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনায় জঙ্গিদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। বগুড়া থেকে উদ্ধার হওয়া জঙ্গিদের দুটি চিঠিতে নির্বাচনের আগে নাশকতার পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, গত ১৯ মার্চ বগুড়ার বাঘোপাড়া বাজার এলাকা থেকে জেএমবির রাজশাহী অঞ্চলের নেতা রফিকুল ইসলাম ওরফে রাকিব, আবু বক্কর ওরফে সীমান্ত ও ইব্রাহিম ওরফে আবিরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আবিরের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় জেএমবির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের উদ্দেশে এক জঙ্গির হাতে লেখা পাঁচ পৃষ্ঠার পৃথক দুটি চিঠি। সেই চিঠি জেএমবির শীর্ষ আমির সালাউদ্দিন ওরফে সালেহীন ওরফে দাদা ভাইয়ের উদ্দেশে লেখা। চিঠিটি জঙ্গিনেতা ইয়ামিন ওরফে শহীদুল্লাহর মাধ্যমে সালেহীনের কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে চিঠিটি পৌঁছানোর আগেই তা গোয়েন্দাদের হাতে ধরা পড়ে।

২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে পুলিশ খুন করে প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যাওয়া সালেহীন বর্তমানে ভারতে থেকে পুরনো জেএমবির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পালিয়ে থাকা আরেক জঙ্গি জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমা মিজান জামা’আতুল মুজাহিদিন ইন্ডিয়া (জেএমআই) নামে সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

দুটি চিঠি কারাগারে বসে লিখেছেন ‘সজল’ (ছদ্মনাম) নামের এক জঙ্গি। চিঠিতে সজল লিখেছেন, ‘অ্যামুনেশন সংগ্রহে তৎপর হওয়া দরকার। সামনে নির্বাচন। বিভিন্ন রকম সহিংসতা হবে। এই সুযোগ কাজে লাগানো দরকার।’ চিঠিতে গত ১৩ নভেম্বর ছয়জনের নামে ১৫ হাজার, ১৫ ডিসেম্বর তিনজনের নামে ১৫ হাজার, ৮ জানুয়ারি তিনজনের নামে ১৫ হাজার টাকা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে জঙ্গিদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়।

এদিকে ২০১৬ সালে রমজানের মধ্যেই ঢাকা গুলশানে হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে। ঈদের দিন কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদগাহের কাছে হামলা চালায় জঙ্গিরা। তবে এবারের ঈদ ঘিরে কোনো হামলার হুমকি নেই বলে দাবি করছেন পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। এর পরও দেশজুড়ে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, এবার ঈদ ঘিরে বড় জঙ্গি হামলার কোনো হুমকি নেই। ২০১৬ সালে শোলাকিয়ায় যে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে জঙ্গি হামলাগুলো হচ্ছে, সেসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই কঠোর নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে।

এসএইচ-১৯/১৫/০৬ (অনলাইন ডেস্ক)