বিএনপির তৃণমুলে হতাশা বাড়ছেই

প্রকাশিতঃ সেপ্টেম্বর ২, ২০১৯ আপডেটঃ ৩:০৬ অপরাহ্ন

দেশে অন্যতম বড় দল বিএনপি ৪১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ সময় বা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে দলটির নেতারা বলছেন।

একযুগের বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকায় সারাদেশে দলটির নেতা-কর্মিদের একটা বড় অংশ নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। বিএনপি অভ্যন্তরীণ কোন্দলও অনেক সময় সামনে এসেছে।

দলের নেতারা মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মিদের সক্রিয় করে দল পুনর্গঠনের উদ্যোগের কথা বলে আসছেন।

কিন্তু সেই উদ্যোগে তেমন কোন অগ্রগতি বা সাফল্য দেখছেন না বিএনপির মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মিদের অনেকে।

এদিকে পহেলা সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবাষিকীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নেতারা হতাশা কাটিয়ে সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করার বিষয়ে জোর দেয়ার কথা বলেছেন।

এবার লম্বা সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির নেতৃত্বের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত দলের নেতা-কর্মিদের মাঝে বার বার হতাশা সৃষ্টি করেছে বলে তাদের অনেকে বলেছেন।

সেই ২০১৪ সালে ৫ই জানুযারির নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে দলটি ব্যর্থ হয়েছিল।

সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর বিএনপির কৌশল নিয়ে দলের ভিতরে অনেক প্রশ্ন ওঠে। সেই নির্বাচনের সংসদকে অবৈধ বলে অভিহিত করার পরও বিএনপি তাতে যোগ দিয়েছে।

এসব কৌশলের কারণে মাঠ পর্যায়ে দলের নেতা-কর্মিদের একটা বড় অংশ হতাশা থেকে নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন বলে তাদের অনেকে বলেছেন।

উত্তরের একটি বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে বিএনপির ভাল অবস্থান ছিল। রাজশাহীর নেত্রী মাহমুদা হাবিবা বলছিলেন, “সাংগঠনিক অনেক দূর্বলতা আছে। সার্বিকভাবে এবং সামগ্রিকভাবে এই দূর্বলতা আছে।”

দলটির শীর্ষ নেত্রী খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় সাজা নিয়ে জেলে রয়েছেন দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে। তাঁকে মুক্ত করতে বিএনপি কোন আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি।

দলটির নেতা-কর্মিদের অনেকের মাঝে এনিয়েই তাদের নেতৃত্বের প্রতি ক্ষোভ রয়েছে।

দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে নির্বাসনে রয়েছেন। দেশে তাঁর বিরুদ্ধে সাজা হয়ে রয়েছে।

জিয়া পরিবারের বাইরে দেশে দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে যে সদস্যরা রয়েছেন, তারা তারেক রহমানের সাথে আলোচনা করেই সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

কিন্তু স্থায়ী কমিটির সদস্যদের কেউ দলের ভেতরে প্রশ্ন ওঠা বা সমালোচনার ভয়ে নিজে থেকে কোন উদ্যোগ নিয়ে নেন না বলে তাদের মাঝে অভিযোগ রয়েছে।

এমন পরিস্থিতির ক্ষেত্রে দলটির অনেকে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের কোন্দল এবং দ্বন্দ্বের বিষয়ও তুলে ধরেন।

বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে বিএনপির একজন নেত্রী নাসিমা আকতার চৌধুরী বলছিলেন, নেতাকর্মিদের সক্রিয় করার জন্য দলের এখনকার নেতৃত্ব ধারাবাহিকভাবে বা পর্যায়ক্রমে সিদ্ধান্ত দিতে পারছে না।

বিএনপি যে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না, সেজন্য দলের ভিতরেই এর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অযোগ্যতার অভিযোগ তোলা হচ্ছে।

দলটির একজন কেন্দ্রীয় নেত্রী এবং সাবেক এমপি নিলুফার চৌধুরী মনে করেন, সঠিক নেতৃত্ব পেলে তাদের দল অল্প সমযেই দূর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারে।

“সঠিক নেতৃত্ব যদি কর্মিরা পেতো,তাহলে দল দ্রুত এগিয়ে যেতো। যারা নিবেদিত, যারা নির্যাতিত, যারা ত্যাগী- এমন নেতৃত্ব যদি আমরা দিতে পারতাম, তাহলে দল এবং বাংলাদেশের মানুষও এর সুফল পেতো। এটা করতে পারলে আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে বেশি সময় লাগবে না।”

বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল করার সময় পার হয়ে গেছে। মাঠের নেতা কর্মিদের সক্রিয় করতে দল পুনর্গঠনের উদ্যোগেও তেমন কোন অগ্রগতি হচ্ছে না বলে নেতা কর্মিরা মনে করছেন।

সারাদেশে বিএনপি ৭৫টি সাংগঠনিক জেলা কমিটির মধ্যে মাত্র ২৩ জেলায় আহবায়ক কমিটি করা গেছে। বাকি জেলাগুলোতে অনেক বছর আগে মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া কমিটিই রয়েছে।

তবে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্য হচ্ছে, তাঁর ভাষায় কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী লীগের এই শাসনের মাঝে সাধ্য অনুযায়ী তারা এগুনোর চেষ্টা করছেন।

“সমস্ত রাষ্ট্রযন্ত্রকে সরকার ব্যবহার করছে। সেটাকে মোকাবেলা করে বিএনপি কিন্তু এখনও পর্যন্ত টিকে আছে। একটা এমন পরিস্থিতি যে, আজকে দেশের অনেক জায়গায় আমাদের দলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর কর্মসূচি পালনে সরকার এবং পুলিশ বাধা দিয়েছে।”

“বিভিন্ন জায়গায় দলের কাউন্সিল করার জন্যও মিলনায়তন পর্যন্ত আমাদের দেয়া হচ্ছে না। আমরা এরই মাঝে দল পুনর্গঠন করছি।”

আলমগীর বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, অনেক নির্যতনের পরও তাদের দলের উল্লেখযোগ্য কেউ দল ত্যাগ করে যাননি।

তবে বিএনপির যে বড় জনসমর্থন রয়েছে, সেটাকে দলটির সব পর্যায়ের নেতা কর্মিরাই এখনও তাদের টিকে থাকার ভরসার জায়গা হিসেবে দেখেন।

গত নির্বাচনের সময় বিএনপি তাদের ২০ দলীয় জোটের বাইরে আরেকটি জোট করেছিল।

নির্বাচনে পরাজয়ের পর ড: কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামের সেই জোট নিয়ে বিএনপি তাদের দলে এবং পুরোনো জোটে সমালোচনার মুখে পড়ে।

দু’টি জোটেই বিএনপি অন্যদের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন রয়েছে।

দলটির নেতারা অবশ্য এই মুহুর্তে জোটের রাজনীতিতে সেভাবে নজর দিচ্ছেন না।

বিএনপি নেতাদের অনেকে মনে করেন, তাদের জনসমর্থন রয়েছে ঠিকই। কিন্তু বাংলাদেশের অতীতে অনেক সময় যে ধরণের সহিংস আন্দোলন হয়েছে, এখন তেমন কর্মকান্ডে মানুষের সমর্থন পাওয়া যাবে না।

এছাড়া সরকারের কঠোর অবস্থানের সামনে বিএনপি সেভাবে দাঁড়াতেও পারবে না।

সেজন্য দলটি সে ধরণের কোন কর্মসূচির ডাক দিয়ে ব্যর্থতার দায় নিতে চায় না বলে মনে হয়েছে।

বিএনপি নেতারা এখন আন্দোলনের ইস্যু নিয়েও চিন্তিত। তাদের অনেকে বলেছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির একক দাবি নিয়ে আন্দোলনে মানুষকে সম্পৃক্ত করা সহজ নয়। সেজন্য তারা এখন মানবাধিকার এবং দুর্নীতির বিষয়সহ সামাজিক অনেক ইস্যুকে সামনে আনতে চাইছেন।

এসব ইস্যুতে অনেক সময় কোন কর্মসূচি নেয়ার ক্ষেত্রে দলের ব্যানার ব্যবহার না করার চিন্তাও দলটিতে রয়েছে।

অবশ্য বিএনপির নেতারা বলছেন, দল কৌশল যাই নিক না কেন, নেতা-কর্মিরা সক্রিয় না হলে কোন ফল আসবে না বলে তারা মনে করেন।

এসএইচ-০৮/০২/১৯ (কাদির কল্লোল, বিবিসি)