রেডিও পদ্মা :দেশের প্রথম কমিউনিটি রেডিওর ৮বছর

প্রকাশিতঃ অক্টোবর ৯, ২০১৯ আপডেটঃ ৬:২৪ অপরাহ্ন

একটু পেছন থেকেইে বলি। আমরা যারা ১৯৮০ থেকে ৯০ সালের মধ্যে জন্মেছি তাদের কাছে বিবিসি, ডয়চেভেলে, ভয়েস অব আমেরিকা’র রেডিও অনুষ্ঠান অপরিচিত কিছু নয়। ভোর বেলা রেডিও যন্ত্রের ভাঁজ করা এন্টেনা টেনে লম্বা করে শর্ট ওয়েভে বিদেশী চ্যানেল খোঁজার স্মৃতি অমলিন নয়। রাস্তা ঘাটে, বাড়ির বারান্দায়, চায়ের দোকানে বাবা দাদারা তখন উচ্চ স্বরে জমায়েত করে খবর শুনতেন।

একটি বিষয় মানতেই হবে, এসব মিডিয়ায় প্রচারিত বাংলাদেশের খবর গন মানুষ এখনও অকপটে বিশ্বাস করে, আস্থা রাখে। সেই থেকে শুরু এরপর বাংলাদেশ বেতারের বিজ্ঞাপন তরঙ্গ, অনুরোধের আসর গানের ডালি, চিঠি পত্রের আসর যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছি আমরা। সপ্তাহের নির্দিষ্ট কোন অনুষ্ঠানে একটি বার নিজের নাম শোনার জন্য কতো যে চিঠি পোষ্টকার্ড পাঠিয়েছি তার ঠিক নেই। এই যে বেতারের প্রতি টান ভালোবাসা সেটি রয়েই গেলো বড় হবার পরও। আধুনিকতা ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতায় এলো এফএম ব্যান্ড এর অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান শোনার সময় আযাচিত শব্দ মাড়িয়ে শুরু হলো নিখুঁত স্পষ্ট ঝকঝকে শব্দের রেডিও অনুষ্ঠানের পর্ব।

২০০৬-০৭ সালের দিকে শুধুমাত্র ঢাকায় যখন বেসরকারি এফএম রেডিও পরিধি বাড়ছে তখন ঢাকায় ভ্রমনকালে সেই অনুষ্ঠান রেকর্ড করে নিয়ে এসে রাজশাহীতে বসে বার বার শোনারও ঘটনাও কম ঘটেনি। এরপর মোবাইলে সেই সুযোগ আরও বেড়ে গেলো এফএম সংযুক্তির পর। দেশের এবং প্রতিবেশী দেশের এফএম অনুষ্ঠান শুনতে শুনতে যেন আমারও রেডিও উপস্থাপক হবার স্বপ্ন ক্রমেই বড় হতে থাকলো। বাংলাদেশ বেতার রাজশাহীতে উপস্থাপক পদের জন্য আবেদন করেছিলাম ২০১০ সালে। দুবছর পাত্তাই দেয়নি, ডাকেও নি। পড়াশোনা প্রায় শেষ, খবর পেলাম রাজশাহীতেই হচ্ছে কমিউনিটি বেতার।

দেরী না করেই শখের বশে আবেদন করলাম, ডাক পড়লো, কন্ঠ পরীক্ষায় টিকেও গেলাম। সত্যি বলছি পেশা হিসেবে নয় নেশা হিসেবে আঁকড়ে ধরে যোগ দিলাম দেশের প্রথম কমিউনিটি বেতার রেডিও পদ্মায়। সালটা তখন ২০১১ সালের জুন মাস। আগষ্ট থেকে শুরু হলো পরীক্ষামূলক সম্প্রচার। এখনও ভাবতে ভালোলাগে আমার এবং আমার মতো আরও অনেকের যেমন রাজিব, সোহরাব, আশা, লাকমিনা জেসমিন, টিটন, রাব্বানী ভাই এর হাতেই দেশে কমিউনিটি বেতারের যাত্রা শুরু হলো।

২০১১ সালের ৭ অক্টোবর আনুষ্ঠানিক সম্প্রচারে গেলো রেডিওটি। তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে এ যাত্রা শুরু হলো। হতে চেয়েছিলাম আনুষ্ঠান বিভাগের উপস্থাপক মানে আরজে। তবে প্রথম প্রশিক্ষনে প্রশিক্ষক আমিন আর রশিদ ভাই আর শাহনাজ শারমিন আপার সেশানে সেই মত পাল্টে চলে গেলাম খবর ও ডকুমেন্টারি বিভাগে। পরে অবশ্য আনুষ্ঠান উপস্থাপনা, খবর পাঠ, সম্পাদনা, রেকডিং সবই করতে হয়েছে। তবে বীজটা সেদিনই বুনেছিলাম। শখ থেকে বেরিয়ে এসে অন্য কাজেরও চেষ্টা করেছি, পারিনি, মন লাগেনি। সবশেষে এই শখটাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করলাম।

টানা সাড়ে তিন বছর কাজ করেছি কমিউনিটি রেডিওতে। নিজের হাতে কতো খবর তৈরী করেছি, পড়েছি, ডকুমেন্টারি বানিয়েছি। রেডিওর বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেয়েছি বহু। সহকারী স্টেশন ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেছি বছর খানেক সময়। কিন্তু সংসার স্বচ্ছল ভাবে চালানোর জন্য মাইনে টা বড্ড কম ছিলো। আবারও আবেদন করলাম বাংলাদেশ বেতারে, এবার হয়েই গেলো। দুই রেডিওতে একসাথে কাজ করতে লাগলাম। চাপ অনেক বাড়তে লাগলো তাই অন্যদিকেও টুকটাক চেষ্টা করতাম। পরীক্ষা দিয়েছিলাম ঢাকার রেডিও ফুর্তি, এবিসি রেডিওতে। এবিসিতে কাজটা হয়েও গেলো কিন্তু পারিবারিক কারণে যেতে পারলাম না।

২০১৪ সালের মার্চে যোগ দিলাম বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল টোয়েন্টিফোরে। প্রশ্ন হলো ছেড়ে এলাম কেনো? আমার কাছে মনে হয়েছে কমিউনিটি রেডিওগুলোর নীতিমালা তৈরী করার সময় এর টিকে থাকার জন্য যে অর্থের প্রয়োজন সেই অর্থ আয়ের বিষয়গুলোতে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়নি। স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে রেডিও সাময়িক চলতে পারে তবে দীর্ঘস্থায়ী ভাবে নয়। একটা মানুষ কাজ শিখতে চাইবে এটা সত্য তবে তার কাজের মূল্যায়ন করাটাও জরুরী।

দেশে এখনও বহু সংখ্যক কমিউনিটি রেডিও আসতে যাচ্ছে, আসছে, সম্প্রচার চালাচ্ছে। কিন্তু গড় পড়তা সবগুলো রেডিওরই একই আর্থিক সমস্যা রয়েছে বলে আমি লক্ষ্য করেছি। বিজ্ঞাপন প্রচারের নীতিমালা শিথিলসহ সরকারের বিশেষ দৃষ্টি না দিলে হয়তো অনেকগুলো কমিউনিটি রেডিও মিলিয়ে যাবে। এটা অস্বীকার করছিনা যে কমিউনিটি রেডিও আমাকে কিছুই দেয়নি। বরং আমি আবরার শাঈর হয়ে উঠেছি সেখান থেকেই।

শুধু কয়েকটি এনজিও প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করে, সরকারি কয়েকটি বিজ্ঞাপন বাজিয়ে একটি কমিউনিটি রেডিও বছরের পর বছর টিকিয়ে রাখা যায়না। শুনেছি নওগাঁর রেডিও বরেন্দ্র, বগুড়ার রেডিও মুক্তি এখন ধুঁকে ধুঁকে চলছে। পুরোনো কর্মীরা সব রেডিও ছেড়ে চলে গেছে নতুন ভবিষ্যতের খোঁজে। এই যদি হয় অবস্থা তাহলে কমিউনিটি রেডিওর সামনের দিন নিয়ে আমিও শঙ্কিত। সরকার চাইছে তৃনমূলের গণমানুষের কন্ঠস্বর তুলে ধরতে। তাদের দাবি দাওয়া তুলে ধরতে কিন্তু যারা এই কাজটির সাথে সম্পৃক্ত তাদের দেকভাল করবে কে? রেডিও আমার শখের জায়গা, যদি বেঁচে থাকি তাহলে আবারও সেখানে কাজ করতে চাই। পৃথিবীর সকল রেডিওর জন্য শুভকামনা রইলো।

এসএইচ-২৫/০৯/১৯ (লেখক : আবরার শাঈর : সাবেক কমিউনিটি রেডিও কর্মী, চ্যানেল ২৪ এর রাজশাহী ব্যুরো প্রধান)