ফের বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তৎপরতা

প্রকাশিতঃ অক্টোবর ২৬, ২০১৯ আপডেটঃ ২:৪৪ অপরাহ্ন

আবারো বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তৎপরতা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)সহ সব বিদ্যুৎ কোম্পানিই বিদ্যুতের মূল্য বাড়াতে চায়। এজন্য তারা ইতিমধ্যেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর জন্য বিইআরসি’র কাছে প্রস্তাব দিয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহে ঘাটতির কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর কাছে পিডিবি মূল্য বাড়ানোর এই প্রস্তাব দেয়।

কমিশন পাইকারি বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব বিবেচনায় নিলে গ্রাহক-পর্যায়েও মূল্য বাড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এই বিষয়ে জানতে চাইলে বিইআরসি’র সদস্য মিজানুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, পিডিবিসহ সব কোম্পানিই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এগুলো খুলে আমরা এখনো দেখিনি। প্রস্তাবগুলো বিশ্লেষণ করে দেখাবো দাম বাড়বে না-কি কমবে। তবে বিদ্যুতের দাম বাড়লে সব পর্যায়েই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি জানান।

এর আগে ২০১৭ সালের ২৩শে নভেম্বর গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানো হয়েছিল। তখন গড়ে ইউনিট-প্রতি ৩৫ পয়সা মূল্য বাড়ানো হয়, যা ওই বছরের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করা হয়। আর ?২০১৫ সালে সর্বশেষ পাইকারি বিদ্যুতের মূল্য ১৮ দশমিক ১২ শতাংশ বাড়ানো হয়। বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব প্রসঙ্গে পিডিবি’র চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালেদ মাহমুদ বলেন, বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর জন্য একটি প্রাথমিক প্রস্তাব দিয়েছি। প্রস্তাবে কোনো সংখ্যার কথা উল্লেখ করিনি।

শুধু লোকসানের একটা হিসাব দিয়েছি। চিঠিতে বলেছি, সময় আসছে, বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। গ্যাসের মূল্য বেড়ে গেছে। গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচও বাড়ছে। ফলে, বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এখন যে বিদ্যুৎ দিচ্ছি তাতে দাম পড়ে ৫ টাকা ২৬ পয়সা। কিন্তু নিচ্ছি ৪ টাকা ৮৪ পয়সা। বাকিটা ভর্তুকি হিসেবে পাচ্ছি।

সূত্র জানায়, পিডিবি’র ২০২০ সালে বিদ্যুৎ বিক্রি করে আয় হতে পারে ৩৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। কিন্তু ওই সময় প্রয়োজন হবে ৪৫ হাজার ২০৮ কোটি টাকা। ফলে বাকি আট হাজার ৬০৮ কোটি টাকা কীভাবে পূরণ করা হবে, তা জানানো হয়েছে কমিশনকে। কমিশন এখন সিদ্ধান্ত নেবে বিদ্যুতের মূল্য বাড়াবে নাকি ভর্তুকির আকারেই পিডিবিকে দেয়া হবে। বিইআরসি সূত্র জানায়, গত সপ্তাহের শেষে তারা এ প্রস্তাব কমিশনের কাছে জমা দেয়। যদি বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব বিবেচনায় নেয়া হয়, তাহলে তা আগামী জানুয়ারি থেকে কার্যকরেরও প্রস্তাব করেছে পিডিবি।

এ প্রস্তাবের সঙ্গে সঙ্গে বিতরণ কোম্পানিগুলোও তাদের নিজেদের লোকসানের হিসাব করা শুরু করেছে। চিঠিতে পিডিবি হিসাব দিয়ে উল্লেখ করেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ছয় হাজার ৭৯ কোটি ৬২ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। গত অর্থবছরে এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ছয় হাজার ৮৬১ কোটি ৬৩ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। চলতি অর্থবছর বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাব্য পরিমাণ দাঁড়াবে সাত হাজার ৫৮৭ কোটি ৪৬ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। ২০২০ সালে এর পরিমাণ দাঁড়াবে সাত হাজার ৯২০ কোটি ৬২ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এই হিসাবে আগামী বছর পিডিবি’র ব্যয় হবে ৪৫ হাজার ২০৮ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। অন্যদিকে ২০২০ সালে পিডিবি’র সম্ভাব্য আয় দাঁড়াবে ৩৬ হাজার ৬৪৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এতে পিডিবি’র ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় আট হাজার ৫৬০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।

পিডিবির প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে বিইআরসির একজন কর্মকর্তা বলেন, কমিশনের কাছে পাইকারি বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব দিয়েছে পিডিবি। সভায় প্রস্তাব অনুমোদন পেতে পারে আবার বাতিলও হতে পারে। যদি অনুমোদন করা হয়, তাহলে গণশুনানিতে বিষয়টি আলোচনা হতে পারে। মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি ভর্তুকি দিয়ে হতে পারে, আবার মূল্য বাড়িয়েও হতে পারে। সেটি পিডিবির লোকসান বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, অযৌক্তিক ব্যয় বৃদ্ধি ধরে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যাবে না। অযৌক্তিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এই ব্যয় দিয়ে রাজস্ব নির্ধারণের নামে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নানা ব্যবসা হচ্ছে। লাগাম টেনে ধরতে হবে।

প্রসঙ্গত, গত ১২ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে মোট ৫৩ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে সরকার। বছরভিত্তিক ভর্তুকির হিসাব বলছে, ২০০৬-২০০৭ অর্থবছরে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৩০০ কোটি টাকা। ২০০৭-২০০৮ অর্থবছরে ৬০০ কোটি, ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে এক হাজার ৭ কোটি, ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে ৯৯৪ কোটি, ২০১০-২০১১ অর্থবছরে ৪ হাজার কোটি টাকা, ২০১১-২০১২ অর্থবছরে ৬ হাজার ৩৫৭ কোটি, ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে ৪ হাজার ৪৮৬ কোটি, ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে ৬ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এরপর ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে ৮ হাজার ৯৭৮ কোটি, ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে ৪ হাজার ৩৬৫ কোটিতে দাঁড়ায়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কমে ৩ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা, এরপর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা, গত অর্থবছরে (২০১৮-১৯) ভর্তুকির পরিমাণ সাত হাজার ৯৭০ কোটি এবং চলতি অর্থবছর ভর্তুকির সম্ভাব্য পরিমাণ ধরা হয়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা।

এসএইচ-০৭/২৬/১৯ (অনলাইন ডেস্ক, তথ্য সূত্র : আমাদের সময়)