ডাস্টবিনে কুড়িয়ে পাওয়া ময়না-রাতুলদের দিন কাটছে কেমন

প্রকাশিতঃ মার্চ ২৩, ২০২০ আপডেটঃ ২:২৭ অপরাহ্ন

বাবা-মা তো আর আইলো না! এখন আমি কি করাম।’ কথাগুলো বলতেই চোখে জমতে থাকা বিন্দু বিন্দু জলে নিষ্পাপ শিশুর বুকফাটা কান্নায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছিলাম আমিও। আমার সঙ্গে থাকা চিত্রগ্রাহক দেলোয়ারের স্বাভাবিক হতে সময় গেল প্রায় মিনিট দশেক।

আবেগী কথাগুলো বলছিল কল্যাণপুর চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ারের আশ্রয়ে থাকা ৫ বছর বয়সী শিশু রাতুল। যার মা তাকে কোনো এক অজানা কারণে ফেলে রেখে যায় রাস্তায় এক চায়ের দোকানে। রাতুলের ভাষ্যমতে, তার বাড়ি বরিশালের কোনো এক গ্রামে। মা বলেছিলেন, বেড়াতে নিয়ে যাবে ঢাকা।

আর সেই মতো ঢাকা বেড়াতে আসা। শিশুপার্কে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশে মায়ের সঙ্গে যাত্রা রাতুলের। কিন্তু মাঝপথে মা রাতুলকে বলেছিল, বাবা তুমি এখানে একটু বসো, আমি চিপস নিয়ে আসছি। একটা চায়ের দোকানে বসিয়ে রেখে, সেই যে মা গেছে আর ফেরেনি। তারপর চা দোকানির মাধ্যমে থানা এবং থানার মাধ্যমে তার স্থান হয়েছে মিলটন সামাদ্দারের চাইল্ড কেয়ারে।

রাতুলের কোনো অভিনাম বা রাগ নেই তাদের ওপর। এখনো বিশ্বাস করে বাবা-মা তাকে এসে নিয়ে যাবে। বড় হয়ে ডাক্তার হতে চায় রাতুল। ডাক্তার হয়ে চেম্বার বন্ধ করে মায়ের জন্য ভাত আর মাছের ঝোল কিনে নিয়ে যাবে, মা প্রাণ ভরে খাবে আর সে মাকে আদর করবে।

এ ধরনের অসংখ্য অমানবিকতার গল্প লুকিয়ে রয়েছে মিলটন সামাদ্দারের চাইল্ড কেয়ারে। আড়াই বছরের নিষ্পাপ ফুটফুটে শিশু সোয়াদ। এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে তার আগমনটাই ছিল কিছু পুরুষরূপী পশুর বুনো লালসার কারণে। তার মা পাচার হয়ে যান ভারতে। আর এভাবেই এক সময় জন্ম নেয় মায়াবী চেহারার শিশু সোয়াদ। তবে সোয়াদের মাও জীবনভর পাপের দায় নিয়ে চলতে নারাজ। তিনিও গ্রহণ করেননি সোয়াদকে। তাই তার ঠিকানা এখন মিলটন সামাদ্দারের চাইল্ড কেয়ারে। সোয়াদ বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী। তবে দেড় লাখ টাকা হলে শ্রবণ যন্ত্র বসিয়ে পুরো স্বাভাবিক করে তোলা সম্ভব তাকে।

এই শিশুটির কি অদ্ভুত একটা যাদু আছে। দ্রুত সে নিজেকে অন্যের ভালোবাসার পাত্র করে নিতে পারে। বারবার কাছে এসে কোলে উঠতে চাইছিল। চিপস, জুস কতো আবদার। প্রতিটি আবদার মিটিয়ে দিনশেষে ফিরে আসার সময় তার বায়না আমার সঙ্গে আসবে সে। কিন্তু বাস্তবতাতো কঠিন তাকে রেখে চলে আসার সময় তার ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে থাকা ও অঝোরে কান্নার দৃশ্যটা মনে হলে এখনো বুকের বাম পাশটায় বারবার মোচড় দেয়। সারা রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে সে।

অন্য শিশুগুলোর গল্পও কিন্তু ভিন্ন নয়। এখানে থাকা ৩ বছর বয়সী ময়নাকে পাওয়া গেছে পলিব্যাগে মোড়া অবস্থায় ডাস্টবিনে। আর ১ বছর বয়সী টিয়ার মা হাসপাতালের বেডে রেখে পালিয়েছে। আর একটি ৩ বছরের মেয়ে বাচ্চা যার মা তাকে রিকশায় বসিয়ে রেখে চিপস কিনে নিয়ে আসার কথা বলে আর ফেরেনি। কারো বাবা-মা পলিথিনে ফেলে গেছে ডাস্টবিনে, কাউকে রিকশায় বসিয়ে পালিয়েছে না, কাউকে বেড়াতে যাওয়ার নাম করে ফেলে গেছে।

মানুষ এতো অমানুষ কীভাবে হয়!! এগিয়েছে সভ্যতা, এগুচ্ছে পৃথিবী। উন্নয়ন কি দিন দিন আমাদের মানব থেকে দানব করে তুলছে? শ্রদ্ধা, স্নেহ, ভালোবাসা নামক শব্দগুলো কী আজ বিপর্যয়ের মুখে! একজন মা অথবা বাবা কীভাবে পারেন তার নিজ সন্তানকে ফেলে দিতে!

বাচ্চাগুলোর কথা ও তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া কথাগুলো বিষয়গুলোর বর্ণনা শুনে কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে নিজেকে ধরে রাখা সম্ভব না। এমনই একজন মানব দরদি মিলটন সামাদ্দার। মিরপুর দক্ষিণ পাইকপাড়ার আট নম্বর রোডে দোতলা মসজিদের কাছে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান।

এসব শিশুর আস্তাকুঁড়ে থেকে কুড়িয়ে তাদের বুকে টেনে নিয়েছেন, দিয়েছেন আশ্রয়, পিতৃস্নেহে তাদের বড় করছেন। আর তিনি তার জীবনকেই উৎসর্গ করতে চান পরিত্যক্ত বা অভিভাবকহীন বৃদ্ধ ও শিশুদের জন্য। তবে তার একার পক্ষে এ সংগ্রামে সফল হওয়া কঠিন। এ জন্য প্রয়োজন সবার মানবিকতা বোধকে জাগ্রত করে যার যার স্থান থেকে একটু এগিয়ে আসা।

এসএইচ-০৮/২৩/২০ (অনলাইন ডেস্ক, তথ্য সূত্র : সময়)