গাড়ির ছাদ দুমড়ে গেলেও দুঃখ পাননি শচিন

প্রকাশিতঃ এপ্রিল ২৫, ২০১৮ আপডেটঃ ১:৪৮ অপরাহ্ন

নিজের গাড়ির ছাদ তুবড়ে গেলে কেউ খুশি হতে পারেন?‌ না, এমন কথা কখনও শোনা যায়নি। সাধের গাড়ির ক্ষতি হলে সকলেই মনমরা হয়ে পড়েন। আপশোসের সীমা থাকে না। তবে খুশি হয়েছিলেন একজন। আর তিনি স্বয়ং শচীন টেন্ডুলকার। কেন খুশি হবেন না?‌ এমন একটা দিনে তাঁর গাড়ির ছাদ তুবড়ে গিয়েছিল, সেদিন যে তিনি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য!‌

কোনও দুর্ঘটনার কবলে পড়ে অবশ্য শচীনের গাড়ির ছাদ তুবড়ে যায়নি। ক্রিকেটপ্রেমীদের আনন্দের আতিশয্যে গাড়ির ক্ষতি। কীভাবে তুবড়েছিল তাঁর গাড়ির ছাদ?‌ সে এক দারুণ মজার ঘটনা। তাঁকে নিয়ে লেখা বই ‘‌ইলেভেন গডস অ্যান্ড আ বিলিয়ন ইন্ডিয়ান্স’–এর‌ প্রকাশ অনুষ্ঠানে শচীন সেই ঘটনার কথা তুলে ধরেন।

ঘটনা এমনই, মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ২০১১ বিশ্বকাপের ফাইনাল। কুসংস্কারের জন্য শচীনের স্ত্রী অঞ্জলি মাঠে আসেননি। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর শচীন অঞ্জলিকে ফোন করে বলেন, ‘‌বাড়িতে বসে কী করছ?‌ স্টেডিয়ামে চলে এসো। আমরা এখানে সেলিব্রেট করছি।’‌

কিছুক্ষণ পরে অঞ্জলি চলে আসেন। স্টেডিয়ামের সামনে এসে দেখেন সমর্থকরা আনন্দে নাচানাচি করছেন, লাফাচ্ছেন। কয়েকজন সমর্থক তো আবার আনন্দে অঞ্জলির গাড়ির ছাদেই লাফিয়ে ওঠেন। সমর্থকদের লাফানোর চোটে গাড়ির ছাদ দুমড়ে যায়। কিছুক্ষণ পর সমর্থকরা আবিষ্কার করেন, ওটা শচীনের স্ত্রী অঞ্জলির গাড়ি। যাই হোক, অনেক কষ্ট করে অঞ্জলি অবশেষে ভারতীয় দলের ড্রেসিংরুমে পৌঁছন।

আরও খবর : বাংলাদেশে শুরু হচ্ছে ১০০ বলের ক্রিকেট

ড্রেসিংরুমে বিজয়োল্লাস সেরে যখন হোটেলের উদ্দেশে রওনা হচ্ছিলেন, শচীন দেখেন তাঁর গাড়ির ছাদ দুমড়ে গেছে। গাড়ির ছাদ দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন শচীন। তাঁর অবশ্য কোনও রাগ কিংবা দুঃখ হয়নি। শচীন বলেন, ‘‌গাড়ির এই ছাদ দুমড়ে যাওয়া আমাকে সব সময় বিশ্বকাপ জয়ের দুর্দান্ত মুহূর্তের কথা মনে করিয়ে দেয়।’‌

যে স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছিলেন, সেই ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামেই জীবনের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছিলেন শচীন, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে জীবনের শেষ টেস্ট। প্রথম ইনিংসে তিনি যখন ৭৪ রানে আউট হয়ে সাজঘরের দিকে ফিরছিলেন, গোটা স্টেডিয়ামের চোখে জল। কারণ সকলেই তখন নিশ্চিত হয়ে গেছেন, ওটাই শচীনের শেষ ইনিংস। শচীনের জীবনের শেষ টেস্ট ভেবেই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টেস্ট ম্যাচটি ওয়াংখেড়েতে ফেলেছিল।

শচীনের মা কখনও মাঠে বসে শচীনের খেলা দেখেননি। তিনি যাতে ছেলের জীবনের শেষ টেস্ট মাঠে বসে দেখতে পারেন, সেটাও একটা কারণ। শচীন নিজেও সে কথা স্বীকার করে নিয়েছেন, ‘‌স্কুল ক্রিকেট থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, আমার মা মাঠে বসে কখনও খেলা দেখেনি। মা যাতে আমার জীবনের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ মাঠে বসে দেখতে পারে, সেজন্যই ম্যাচটা ওয়াংখেড়েতে দেওয়া হয়েছিল।

আমি মাকে বলেছিলাম, ক্রিকেটের জন্য আমি ৩০ বছর ঘর ছেড়েছি। কেন ঘর ছেড়েছি একবার অন্তত তোমার মাঠে এসে দেখা উচিত। মায়ের জন্য সব রকমের ব্যবস্থাই করা হয়েছিল। আমার বন্ধুদের সঙ্গে মা এসে প্রেসিডেন্ট বক্সে বসেছিল।

টসে জিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিতেই সবাই বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা ভেবেছিল। একজন একটু অন্যরকম ভেবেছিল। তার মনে হয়েছিল, দিনের শেষবেলায় ভারত ব্যাটিং করতে পারে।’‌ ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১৮২ রানে শেষ হয়ে যাওয়ার পর ভারত ব্যাট করতে নেমেছিল। শচীনকেও ব্যাট হাতে মাঠে নামতে হয়েছিল।

তিনি যখন ক্রিজে, জায়ান্ট স্ক্রিনে ভেসে উঠেছিল তাঁর মায়ের ছবি। জায়ান্ট স্ক্রিনে মাকে দেখে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলেন শচীন। তিনি নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন, ‘‌প্রথম দিনে আমি ২০–‌‌২৫ মিনিট ব্যাটিং করেছিলাম। শেষ ওভারের আগে ড্যারেন সামি যখন বোলিং রান আপে, বড় স্ক্রিনে মাকে দেখতে পেয়েছিলাম। মাও বুঝতে পেরেছিল তাঁকে জায়ান্ট স্ক্রিনে দেখানো হচ্ছে। ওইরকম দুর্লভ মুহূর্ত মায়ের জীবনে প্রথম এসেছিল। মাকে জায়ান্ট স্ক্রিনে দেখে আমি আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলাম।

অনেক কষ্টে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করেছিলাম। মায়ের পর একে একে অঞ্জলি ও আমার পরিবারের সদস্যদের ক্যামেরায় ধরা হচ্ছিল। প্রতিটা বলের পর আমার কাছে কাজ কঠিন হয়ে পড়ছিল। শুধুই ভাবছিলাম, এরপর কে?‌ তখন নিজেকে বলছিলাম, এ–‌সব ছেড়ে পরের বল খেলার জন্য মনঃসংযোগ করো। এটা আমার কাছে অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা।

কারণ এই ধরনের ঘটনা কখনও ঘটবে, ভাবিনি।’‌ এই প্রসঙ্গে শচীন আরও বলেন, ‘‌ক্রিকেটার হিসেবে জীবনের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ নিয়ে নানা রকম প্রশ্ন ঘুরপাক খাওয়ার কথা। শেষ ম্যাচে কি জয় পাব?‌ দর্শকদের কেমন প্রতিক্রিয়া হবে, এ–‌সব কিন্তু আমার মাথায় আসেনি। স্ক্রিনে পরিবারকে দেখে আমি আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলাম, চোখে জল এসে গিয়েছিল। সঠিকভাবে বল দেখতে না পেলে আমি শেষ হয়ে যাব। এই কারণেই আমি আউট হয়েছিলাম।’‌

কখনও লেগস্পিন, কখনও অফস্পিন, গুগলিতে ব্যাটসম্যানকে বোকা বানাতে বেশ সিদ্ধহস্ত ছিলেন শচীন। অনেকের ধারণা, অফস্পিনার কখনও লেগস্পিন করতে পারেন না। এই ধারণার সম্পূর্ণ বিরোধী শচীন। যে অফস্পিনার লেগস্পিন করতে পারেন, তাঁকে বহুভাষীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। শচীন বলেন, ‘‌এটা ঠিক দু–তিনটি ভাষা জানার মতো।

পাঁচ–ছটা ভাষা জানতে তো কোনও ক্ষতি নেই। এটা কারও কাছ থেকে কিছু কেড়ে নিচ্ছে না। কোনও বোলার যখন বোলিংয়ে নানারকম বৈচিত্র‌্য নিয়ে আসে, এটা ঠিক তেমনই। একজন অফস্পিনার লেগস্পিন বল করতে পারে না, মানুষের এই ধারণা ভুল। আমি সেই বোলারকে কোনও দোষ দেব না, যারা এটা ভাবে তাদের দোষ দেব।

কোনও অফস্পিনার যদি দুসরা করে, তাহলে বলা হয় এটা তার অস্ত্র। পরিস্থিতি যদি কোনও অফস্পিনারকে লেগস্পিন করতে বাধ্য করে, তাহলে তাকে সেই বোলারের দুর্বলতা কেন বলব?‌’‌ নিজের উদাহরণ তুলে ধরে শচীন বলেন, ‘‌একটা ম্যাচে বাঁহাতিদের ক্ষেত্রে আমি অফস্পিন করতাম। আর ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের বেলায় লেগস্পিন। দু’‌ধরনের বোলিং করতে পারলে সমস্যা কোথায়?‌’‌‌‌

এসএইচ-২৫/২৫/০৪ (স্পোর্টস ডেস্ক, তথ্যসূত্র : আজকাল)