প্রথম ছয় ছক্কার গল্প (অডিও)

প্রকাশিতঃ নভেম্বর ৮, ২০১৮ আপডেটঃ ১:৫৯ অপরাহ্ন

১৯৬৮ সালের ৩১ আগস্ট সোয়ানসিতে নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে গ্ল্যামারগনের বিরুদ্ধে খেলতে গিয়ে সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার গারফিল্ড সোবার্স ৬টা ছয় মেরেছিলেন গ্ল্যামারগনের ম্যালকম ন্যাশকে। ভারত বনাম ইংল্যান্ডের তুমুল উত্তেজনার সিরিজ শেষ হওয়ার পর থেকে বিলেত এখন মেতে উঠতে চাইছে প্রথম ছয় ছক্কার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে। বিবিসি চেয়েছিল গ্যারি সোবার্সকে বার্বাডোজ থেকে উড়িয়ে আনতে। ম্যালকম ন্যাশ তো থাকেন সোয়ানসির আগের মাঠের কাছেই। ফলে চমৎকার একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করার পরিকল্পনা আপাতত ভেস্তে গিয়েছে। স্যর গ্যারি সোবার্স আসতে রাজি হননি।

টেলিফোনে কথা হলে তিনি বলেন বার্বাডোজের বাড়িতে আছেন। প্রথমেই বলে দিলেন, ‘‌আমার বয়স এখন ৮২। সবসময় সব জায়গায় যাওয়া যায়?‌ হাঁটুর চোট নিয়ে তো কাহিল হয়ে বসে আছি বহুদিন।’‌ ৫০ বছর আগের ঘটনা হলেও গ্যারির কাছে কিন্তু ছয় ছক্কার স্মৃতি রয়েছে আজও উজ্জ্বল। ‘‌আমাকে নিয়ে আলোচনা করলে অস্বস্তি হয়। যতবার এই ছয় ছক্কা নিয়ে আলোচনা হবে, ততবারই কিন্তু ম্যালকম ন্যাশকে কুঁকড়ে যেতে হয়। ও বেচারি ভাবতে পারে, আমি ওকে ছোট করার চেষ্টা করছি। পরে তো যুবরাজও ছয় ছক্কা মেরেছে। বিনিত্রি ম্যাসক্যারেনহাসও এক ওভারে ছয় ছক্কা মেরেছে। রবি শাস্ত্রীর ছয় ছক্কা আছে। জানি, প্রথম ৬টা ছয় মেরেছি বলেই বেশি আলোচনা হয় আমাকে নিয়ে।’‌

অনেক পীড়াপীড়ির পর এই ৬টি ছক্কার স্মৃতি মনে করার অনুরোধ জানালাম, ‘‌সেদিন নটিংহ্যামকে দ্রুত রান তুলতে হত। আমাদের রান ছিল ৫ উইকেটে ৩০৮। রান ভালই ছিল, কিন্তু তাড়াতাড়ি আরও বেশি তোলার প্রয়োজন ছিল বলে ন্যাশের প্রথম দুটি বল মিড উইকেটের ওপর দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। পরের বল ন্যাশ রেখেছিল অফস্টাম্পের বাইরে। আমি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম লং অনের মাথার ওপর দিয়ে। পরপর ৩টি ছয়। রানের গতি বাড়ছিল।

কী মনে হল জানি না, চতুর্থ বল ব্যাকওয়ার্ড স্কোয়্যার লেগের মাথার ওপর দিয়ে ছয়। ছক্কার নেশায় মেতে গিয়েছিলাম যেন। এবং তা করতে গিয়ে পঞ্চম বলে আরেকটু হলে আউট হয়ে যাচ্ছিলাম। প্যাভিলিয়ন প্রান্তের সামনে, লং অফে দাঁড়িয়েছিল গ্ল্যামারগনের ফিল্ডার রজার ডেভিস। পঞ্চম ছয়টা সীমানার ওপরে যাওয়ার আগের মুহূর্তে ওই ফিল্ডার ধরে নিয়েছিল। কিন্তু বল ধরার পর নিজের বডি ব্যালান্স রাখতে না পেরে বাউন্ডারি লাইনে আকাশের দিকে মাথা রেখে শুয়ে পড়েছিল। কিন্তু শরীর ছিল সীমানার বাইরে। তাই ছয়।’‌

শেষ ছক্কার আগে নিজেকে কীভাবে তৈরি রেখেছিলেন?‌ এই প্রশ্নের জবাবে গ্যারি বলে গেলেন, ‘‌ছোটবেলায় একদিন সকালে আলোচনা চলছিল লিয়ারি কনস্ট্যানটাইনের সঙ্গে স্যর এভার্টন উইকসের। আলোচ্য বিষয় ছিল, ক্রিকেট খেলা ঠিক কেমন?‌ কনস্ট্যানটাইন বলেছিল, বল আকাশে তুলে মারো, যেখানে কোনও ফিল্ডার থাকবে না। তোমার মারা শট চলে যাবে বাউন্ডারির বাইরে।

যা শুনে উইকস বলেছিল, আমি চাই বল মাটিতে রেখে খেলতে। ক্যাচ উঠবেই না, যদি সব বল ঘাসের ওপর রাখতে পারি। তো, আমি কনস্ট্যানটাইনের ব্যাটিংয়ের মতাদর্শ অনুসরণ করে এসেছি চিরকাল। সেদিন তাই শেষ বলে ছক্কা মারার আগে নিজেকে বলেছিলাম, ছয় তো মারবই। নিজে বোলার হওয়ায় জানতাম, এসব ক্ষেত্রে বোলাররা একটু জোরের ওপর বল করে। তো, আমি তো প্রস্তুতই ছিলাম। ন্যাশের বল মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে উড়িয়ে দিয়েছিলাম মিড উইকেটের ওপর দিয়ে।’‌

ছয় ছক্কার মহানায়ক এভাবেই যখন ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে স্মৃতিচারণ করলেন, তখন ম্যালকম ন্যাশকে পাওয়া গেল গ্ল্যামারগনের গল্ফ কোর্সে, ‘‌৭৩ বছর বয়স হয়ে গেল আমার। হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। বয়সোচিত কারণে গুটিয়ে নিচ্ছি দ্রুত। কিন্তু মাঠ আমায় টানে, তাই মাঝেমধ্যে অল্পস্বল্প কোচিং করি। এখন আর পরিচিত লোকেরা ছয় ছক্কা নিয়ে প্রশ্ন করে আমাকে বিব্রত করে না। এ সব ঘটে একবারই। এবং আমার ক্ষেত্রে দুনিয়া মনে রেখেছে, গ্যারি সোবার্স আমায় পিটিয়েছে বলে। আরে মেরেছে তো স্যর গারফিল্ড সোবার্স!‌ এতে লজ্জাবোধ হবে কেন?‌ এক–‌একটা দিন খারাপ যায়। ৫০ বছর আগে ৩১ আগস্ট দিনটা ছিল স্যর গ্যারির, আমার নয়। শেষ বলে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলাম যাতে গ্যারি ছয় মারতে না পারে। জোরের ওপর শর্ট বল করেছিলাম। মাই গুডনেস!‌ আগের থেকেই অনুমান করে বল উড়িয়ে দিয়েছিল সীমানার বাইরে।’‌

বলা হয়, গ্ল্যামারগন অধিনায়ক টনি লুইস নাকি ম্যালকম ন্যাশকে অন্যরকমভাবে বলটা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এ প্রশ্নের সামনে ম্যালকম ন্যাশ বললেন, ‘‌আমিও শুনেছি এ কথা। আজগুবি। যে বোলারের বলে ৫টা ছক্কা হয়ে গেছে, তাকে কি কেউ কখনও পরামর্শ দিতে আসে?‌ অ্যাবসলিউটলি ইমপসিবল। কেউ আসেনি। ডিপ মিড অন, ডিপ মিড অফ ছিল সীমানার ধারে। ছয় বঁাচাতে হবে তো!‌ বোলারের কাছে ঘুরঘুর করবে কেন?‌ তাই টনি লুইস আমার কাছে আসেনি। পঞ্চম বলে যে ক্যাচ উঠেছিল, সেটা যদি রজার ধরে নিত, তা হলে ৫০ বছর পর ছয় ছক্কার জন্য সেলিব্রেশন করতে হত না। আমি ছিলাম একজন সাধারণ ক্রিকেটার। ক্রিকেট দুনিয়া মনে রাখছে, মনে রাখবে, গারফিল্ড সোবার্স আমার বলে ছয় ছক্কা মেরেছে বলে। তা না হলে, গ্ল্যামারগনের এই বঁাহাতি স্পিনারের কথা কে মনে রাখত?‌’‌

ঠিকই বলেছেন। এবং সবশেষে জানিয়ে দিলেন, ‘‌গ্যারিকে আমার স্যালুট জানিয়ে দেবেন। এখন কেমন আছে?‌’‌ জানালাম, বার্বাডোজে। কারণ, এই প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছিলাম প্রথমে ন্যাশের সঙ্গেই। তারপর টেলিফোন বেজেছিল বার্বাডোজের বাড়িতে। একটা ব্যাপার স্পষ্ট, স্যর গ্যারি এবং ম্যালকম ন্যাশ দু’‌জনেই কিন্তু ছয় ছক্কার বর্ণনা দিলেন একইরকম ভঙ্গিতে। একজনের স্মৃতি সুখের, অন্যজনের দুঃখের। কিন্তু মনে রেখেছেন দু’‌জনে একইভাবে।‌‌‌

এসএইচ-০৫/০৮/১১ (স্পোর্টস ডেস্ক, তথ্য সূত্র : আজকাল)