দেশের সবকিছু চলে বঙ্গবন্ধুর অঙ্গুলী হেলনে

প্রকাশিতঃ মার্চ ২৫, ২০১৯ আপডেটঃ ১২:০৪ পূর্বাহ্ন

২৫ মার্চ, ১৯৭১। ভেস্তে যায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমঝোতা বৈঠক। বাঙালী জাতি নিশ্চিত হয়, আলোচনা নয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমেই ছিনিয়ে আনতে হবে মহার্ঘ্য স্বাধীনতা। একাত্তরের এদিন বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠেও উচ্চারিত হয়- আমরা আর মুখ বুঝে সহ্য করব না। এবার আঘাত এলে হানা হবে পাল্টা আঘাত। সে লক্ষ্যে প্রতিটি বাঙালীকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

একাত্তরের এ দিনটিও ছিল আন্দোলনমুখর। দেশের সবকিছু চলছে বঙ্গবন্ধুর অঙ্গুলী হেলনে। কিন্তু বাঙালী জাতি সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত বুঝতে পারেনি আর কয়েক ঘণ্টা পর নেমে আসবে অমানিশার অন্ধকার। বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার পরই গণহত্যার হুকুম দিয়ে বাংলাদেশের মাটি ত্যাগ করে পাকিস্তানে ফিরে যান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। বঙ্গবন্ধুও কয়েকদফা বৈঠক করেন দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে। আর রাতেই বাঙালী জাতির স্বাধীনতার স্বপ্ন আন্দোলনকে চিরদিনের মতো স্তব্ধ করে দিতে পাক হানাদার চালায় নির্মম হত্যাযজ্ঞ।

সেই রাতের আক্রমণের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না এদেশের মানুষ। একাত্তরের অগ্নিঝরা এদিনে বাঙালী জাতি তথা বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছিল ইতিহাসের জঘন্যতম নৃশংসতা। গণহত্যার নীলনক্সা অপারেশন সার্চলাইট নামে পাকিস্তানী দানবরা মেতে ওঠে নির্বিচারে স্বাধীনতাকামী বাঙালী নিধনযজ্ঞে। এ রাতেই বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মমুহূর্তটি প্রত্যক্ষ করেছিল বিশ্ববাসী। ঢাকাসহ দেশের অনেকস্থানে ভয়ঙ্কর মাত্র এক রাতেই হানাদাররা হত্যা করেছিল হাজার হাজার ঘুমন্ত বাঙালীকে।

কিন্তু ওই ভয়ঙ্কর রাতে বসে থাকেনি বীর বাঙালী। মুক্তিযুদ্ধের সাক্ষী হয়ে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রথম সম্মুখসমরে পুলিশ বাহিনীর অস্ত্রগুলো গর্জে উঠেছিল আজ থেকে ৪৮ বছর আগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাযজ্ঞের পর পাক হানাদাররা আঘাত হানে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে। ব্যারাক থেকে বাঙালী পুলিশ সদস্যরা তালাবদ্ধ অস্ত্রাগার ভেঙ্গে হাতে তুলে নেন অস্ত্র ও গুলি।

গড়ে তুলে সশস্ত্র প্রতিরোধ। দু’পক্ষের মধ্যে চলে প্রচ- গোলাগুলি। কিন্তু পাক বাহিনীর অত্যাধুনিক মেশিনগান, মর্টার ও হেলিকপ্টার গানশিপের প্রচন্ড আক্রমণে পুলিশ বাহিনী বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারেনি। সশস্ত্র প্রতিরোধে পাক হানাদারদের হামলায় দুজন ডিআইজিসহ অসংখ্য পুলিশ সদস্য শহীদ হন। রাতভর চলে লুটপাট। পুলিশ সদস্যদের ওপর চলে নির্যাতন, হত্যাযজ্ঞ। পুড়িয়ে দেয়া হয় পুলিশের হেড কোয়ার্টার।

এক রাতেই রাজারবাগ পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। রাজারবাগ আক্রান্ত হওয়ার পরপরই ওয়ারলেস বা বেতারযন্ত্রের অপারেটর কনস্টেবল মোঃ শাহজাহান মিয়া জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজ উদ্যোগে ইংরেজীতে পাকিস্তানী সেনাদের আক্রমণের বার্তাটি দেশের সব থানায় পাঠিয়ে দেন। ২৫ মার্চ তিনি তাঁর বার্তায় বলেন, ‘বেইজ ফর অল স্টেশন্ অব ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ, কিপ লিসেন এ্যান্ড ওয়াচ, উই আর অলরেডি এটাকড বাই পাক আর্মি। ট্রাই টু সেভ ইয়োরসেলভ, ওভার।’ রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনি বেতারযন্ত্রটির মাধ্যমে সারা দেশে এই বার্তা প্রচার করেন। রাজারবাগের জাদুঘরে সেই বেতারযন্ত্রটি স্থান পেয়েছে।

৪৮ বছর পর হলেও এবারে ২৫ মার্চ এসেছে এক ভিন্নমাত্রা নিয়ে। পরাজিত পাকিস্তানীদের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে একাত্তরের মতোই গর্জে উঠেছে বীর বাঙালী। গত বছর জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতভাবে ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবেও দিবসটিকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে সরকার। এ দাবিতে আজ কিছু সময়ের জন্য অন্ধকার হয়ে যাবে গোটা দেশ। গণহত্যা দিবসে তাই এবার বাঙালী জাতি কৃতজ্ঞচিত্রে আজ নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্মরণ করবে শহীদ বীর বাঙালীদের।

 এসএইচ-০১/২৫/১৯ (অনলাইন ডেস্ক)