বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী লাবণ্যের এমন মৃত্যু কাঁদাবে আপনাকেও

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী

নিজেদের প্রাইভেটকারে রাজধানীর শ্যামলীর বাসা থেকে মহাখালীর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে যেতেন শিক্ষার্থী ফাহমিদা হক লাবণ্য (২১)। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। গতকাল বৃহস্পতিবার একমাত্র ছোট ভাই ফারহানুল হক মৃদুল তার বোনের গাড়িটি নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার আবদার করে। ভাইয়ের আবদার রক্ষায় গাড়ি রেখেই সকাল ১১টার দিকে বাসা থেকে বের হন বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে। রাস্তা থেকে মোবাইল অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেলে ওঠেন লাবণ্য। মোটরসাইকেলটি শেরেবাংলা নগরে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সামনে পৌঁছলে একটি গাড়ি পেছন থেকে তাতে ধাক্কা দেয়। মোটরসাইকেল থেকে তিনি ছিটকে পড়েন বাম পাশে আর মোটরসাইকেলের চালক পড়েন ডান পাশে। এ সময় গাড়িটি লাবণ্যর ওপর দিয়ে চলে যায়। এতে প্রাণ হারান তিনি। লাবণ্যের এমন মৃত্যু তার একমাত্র ভাই মৃদুলকেই পোড়াচ্ছে সবচেয়ে বেশি। হাসপাতালে বোনের নিথর দেহের পাশে মৃদুল বিলাপ করছিল- ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে গাড়ি নিয়ে যেত আপু। আজ (বৃহস্পতিবার) আমি গাড়ি নিয়ে ঘুরতে যাব বলে আপু মোটরসাইকেলে যাচ্ছিল। আপুকে গাড়ি দিলে এই ঘটনা ঘটত না। আমার জন্যই আপুর মৃত্যু হলো। কেন বোনের কাছে এমন আবদার করতে গেলাম। গাড়িটি কেন আমি রেখে দিলাম।’

এর আগে গত ১৯ মার্চ প্রগতি সরণিতে বাসচাপায় প্রাণ হারান বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী। ওই ঘটনার পর নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতের দাবিতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। তবে লাবণ্যের মৃত্যু আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল- কারও জীবনের নিরাপত্তা নেই সড়কে।

গতকাল বিকেলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে গিয়ে দেখা যায়, লাবণ্যর মৃত্যুর খবর পেয়ে বাবা-মা, একমাত্র ভাই মৃদুল, স্বজনসহ সহপাঠীরা সেখানে জড়ো হয়েছেন। একমাত্র মেয়ের অকাল মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ী বাবা এনামুল হক ও মা ফারজানা হক। ছোট ভাই মৃদুল কান্নায় ভেঙে পড়ে মর্গ চত্বরে। সহপাঠী ও বন্ধুরাও ধরে রাখতে পারেননি চোখের পানি। সবার আহাজারিতে শোকার্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয় সেখানে।

নিহতের স্বজনরা জানিয়েছেন, শ্যামলীর তিন নম্বর সড়কের একটি বাসায় পরিবারের সঙ্গে থাকতেন লাবণ্য। তাদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার হরিপুরে। ছোট ভাই মৃদুল এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। লাবণ্যের সহপাঠীরা বলেছেন, তারা তার মোবাইল ফোন চেক করে জানতে পেরেছেন, মোটরসাইকেল রাইডার ছিল উবারের। তার নাম সুমন। পুলিশও একই তথ্য জানিয়েছে।

শেরেবাংলা নগর থানার ওসি জানে আলম মুন্সী সমকালকে বলেন, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী গাড়ি চিহ্নিত করা যায়নি। প্রাথমিকভাবে দুই ধরনের গাড়ির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। কেউ বলছে কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায়। কেউ বলছে পিকআপ চাপায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। উবারের মোটরসাইকেল চালককে খোঁজা হচ্ছে। তাকে পেলেই গাড়ি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা এনামুল হক বাদী হয়ে রাতে মামলা করেছেন। এতে অজ্ঞাত গাড়ির চালককে আসামি করা হয়েছে। রাতেই সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

লাবণ্যর খালাত ভাই ফেরদৌস রহমান রাকিব সন্ধ্যায় সমকালকে জানান, লাবণ্যদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ হলেও মৃতদেহ সাভারে নানাবাড়ি নেওয়া হবে এবং সেখানেই দাফন করা হবে।

প্রত্যক্ষদর্শী সোহেল রানা নামে এক ফল ব্যবসায়ী বলেন, একটি পিকআপ মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দেয়। এতে পেছনে বসে থাকা তরুণী ও মোটরসাইকেল চালক পড়ে যান। পিকআপটি মেয়েটির ওপর দিয়ে চলে যায়।

পুলিশ জানিয়েছে, দুপুর ১২টার দিকে এ দুর্ঘটনার পর লাবণ্যকে উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তার মাথার একপাশ থেঁতলে গেছে। মোটরসাইকেল চালক প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে পালিয়েছেন।

শেরেবাংলা নগর থানার এসআই নুরুল ইসলাম বলেন, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল থেকে ‘৯৯৯’-এ ফোন করে বলা হয় দুর্ঘটনায় আহত দুইজন তাদের হাসপাতালে এসেছে। পুলিশ হাসপাতালে যাওয়ার আগেই মেয়েটির মৃত্যু হয়।

একমাত্র মেয়ে নিহতের ঘটনায় সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গের সামনে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা-বাবা, ভাই, স্বজন ও সহপাঠীরা। মা ফারজানা হকের আর্তনাদ- চায়ের মধ্যে বেশি কফি মিশিয়ে আর চা বানাতে আবদার করবে না তার একমাত্র মেয়েটি। এটি হত্যাকাণ্ড দাবি করে বিচার দাবি করেন তিনি।

লাবণ্যর বান্ধবী তামান্না সুলতানা ইলা জানান, তৃতীয় শ্রেণি থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত তারা একই সঙ্গে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়েছেন। এরপরই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গিয়ে তারা আলাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। তবে বন্ধুত্ব অটল থাকে তাদের। তামান্না বলেন, বুধবারও তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে লাবণ্যর কথা হয়। লাবণ্য তাকে বলেছিলেন, তৃতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ। বৃহস্পতিবার পরীক্ষার ফল দেখতে যাবেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরীক্ষায় কত নম্বর পেলেন তা আর দেখা হলো না তার।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ফেরদৌসী বেগম বলেন, লাবণ্যর মৃত্যুর সংবাদ তিনি টেলিভিশনের খবরে দেখেছেন। তিনি জানান, লাবণ্য ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে এইচএসসি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী ছিলেন লাবণ্য। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ অর্জন করেন। ২০১৬ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করে ভিকারুননিসা ছাড়েন লাবণ্য। ক্লাসে শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে আচরণে থাকত মুগ্ধতার আবেশ। সবার সঙ্গে সবসময় হাসিমুখে কথা বলতেন তিনি। ক্লাসে তাই সবার প্রিয় মুখ ছিল লাবণ্য।

দুপুরের পর লাবণ্যর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সহপাঠীরা হাসপাতালের সামনে এসে ভিড় জমাতে শুরু করেন। তাদের অনেকের কণ্ঠে ছিল ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। তারা ওই গাড়িচালক ও উবার চালকের শাস্তি দাবি করেন। তারা বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় বারবার শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ নিহত হচ্ছে। অথচ টনক নড়ছে না সংশ্নিষ্টদের।

আরএম-০২/২৬/০৪ (অনলাইন ডেস্ক, তথ্যসূত্র: দৈনিক সমকাল)