বাংলাদেশের প্রমোশন: বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের উপহার

প্রকাশিতঃ মার্চ ২২, ২০১৮ আপডেটঃ ১১:২১ অপরাহ্ন

মুখে মুখে অনেকেই বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন, সোনার বাংলা গড়া ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু মুখে মুখে বললেই হবে না। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে কাজ করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হলো ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। সেই কাজটা আমাদেরই করতে হবে। সবাইকে মিলে করতে হবে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেই পথেই এগুচ্ছে বাংলাদেশ। তবে উন্নয়ন আর অগ্রগতির অনেক অর্জন ম্লান হয়ে যাচ্ছে গণতন্ত্র, সুশাসনের ঘাটতি ও মানবাধিকার পরিস্থিতিতে।

১৭ মার্চ ছিল বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। নানা আয়োজনে দিবসটি পালিত হয়েছে। এসব আয়োজনে সেই কথাগুলো বারবার উচ্চারিত হয়েছে। তবে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে সবচেয়ে বড় উপহারটা এসেছে জাতিসংঘের কাছ থেকে। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি-এর ২০তম অধিবেশনে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হওয়ার প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জনের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত চিঠিও হস্তান্তর করা হয়েছে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেনের কাছে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অনেক অর্জন আছে। তবে এই অর্জনটি সবচেয়ে সম্মানের একটি। একই সঙ্গে এটি অনেক কষ্টার্জিতও। কথা বলে, বক্তৃতা দিয়ে, লিখে এই অর্জন সম্ভব নয়। এই অর্জনের জন্য সিডিপির কঠোর নজরদারিতে থাকতে হয়েছে। সিডিপি তিন বছর পরপর স্বল্পোন্নত দেশগুলোর বিভিন্ন সূচক মূল্যায়ন করে। তারপরই আসে ঘোষণা। এটা নিছক প্রাথমিক ঘোষণা, উন্নয়নশীল দেশের পথে যাত্রা। পূর্ণাঙ্গ ঘোষণা আসতে আরও ৬ বছর লাগবে। তিন বছর পর সিডিপি বাংলাদেশের অগ্রগতি পুনর্মূল্যায়ন করবে।

সিডিপি বিশ্বের দেশগুলোকে তিনভাবে ভাগ করে- স্বল্পোন্নত, উন্নয়নশীল এবং উন্নত। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাভুক্ত হয়। স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল ধাপে উন্নীত হতে হলে আর্থসামাজিক তিনটি সূচকের অন্তত দুটি পূরণ করতে হয়। এগুলো হলো, মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি বা ভঙ্গুরতা সূচক। সন্তুষ্টির কথা হলো, দুটি নয়, বাংলাদেশ তিনটি সূচকেই মান অর্জন করে উন্নয়নশীল দেশের পথে যাত্রা শুরু করেছে।

গত ৪৬ বছরের ইতিহাসে আর কোনও দেশের এ কৃতিত্ব নেই। মাথাপিছু আয়ের বিবেচনায় বিশ্বব্যাংক বিশ্বের দেশগুলোকে চারভাগে ভাগ করে- নিম্ন, নিম্নমধ্যম, মধ্যম এবং উচ্চ আয়। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ নিম্ন আয় থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের সারিতে উন্নীত হয়েছে। সেই অর্জনেই ছিল আরও বড় অর্জন উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার হাতছানি। মাথাপিছু আয়ের প্রমোশনের পালকিতে চড়েই এলো উন্নয়নশীল দেশের পথে যাত্রার খবর।

যাত্রা শুরু হলো বটে। তবে এই পথটি অনেক বন্ধুর। ঘোষণা হয়েছে, শুধু প্রবেশের। এখন প্রশ্ন হলো টিকে থাকার। আরো দুই দফা ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন শেষে ২০২৪ সালে চূড়ান্ত ঘোষণা আসবে। কাগজে-কলমে স্বল্পোন্নত দেশে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও বাস্তবে সে সুযোগ নেই। কারণ, তিনটি সূচকেই বাংলাদেশের অবস্থা বেশ দৃঢ়। উন্নয়নশীল দেশ হতে হলে মাথাপিছু আয় হতে হয় ১ হাজার ২৩০ ডলার। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৬১০ ডলার।

কিন্তু জাতিসংঘের হিসাবে তা ১ হাজার ২৭৪ ডলার। তার মানে বাংলাদেশের হিসাব দেখেই জাতিসংঘ বাংলাদেশকে প্রমোশন দিয়ে দিয়েছে এমন মনে করার কোনও কারণ নেই। মানবসম্পদ সূচকে ন্যূনতম অর্জন লাগে ৬৬, বাংলাদেশের ৭৩ দশমিক ২। উন্নয়নশীল দেশ হতে হলে অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক ৩২-এর কম হতে হয়। বাংলাদেশের অর্জন ২৫ দশমিক। তার মানে বাংলাদেশ বেশ নিরাপদ অবস্থানেই আছে। বড় রকমের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় বাংলাদেশের চূড়ান্ত অন্তর্ভুক্তি সময়ের ব্যাপার মাত্র।

কিছু মানুষ আছে, যারা সবকিছুতেই নেতিবাচকতা খোঁজে। তারা কখনোই অর্ধেক গ্লাস ভরা দেখে না, খালি দেখে। বাংলাদেশের এই অর্জনও তাদের চোখে অর্জন নয়, বিসর্জন। তাদের দাবি খুব একটা মিথ্যাও নয়। উন্নয়নশীল দেশ হলে বাংলাদেশ আর অল্প সুদে ঋণ পাবে না। রফতানিতেও হারাবে নানা সুবিধা। অর্থনৈতিক বিবেচনায় বাংলাদেশ বড় চাপের মুখে পড়বে। তাহলে কি স্বল্পোন্নত থেকে যাওয়াই ভালো ছিল?

এই প্রশ্নের উত্তর আমি দেবো না, আপনিই বুঝবেন। আচ্ছা গ্রামের একটা ভিক্ষুকের সংসারের কথাই ধরুন। তিনি নিয়মিত ভিক্ষা পান। গ্রামের মানুষের জাকাত ফেতরা পান। উৎসবে-উপলক্ষে বখশিশ পান। কুরবানির সময় মাংস পান। বয়স্ক ভাতা পান। লাইনে দাঁড়িয়ে ন্যায্যমূল্যের চাল কেনেন। বিপদে-আপদে, অসুখ-বিসুখে হাত পাতলে অনেকে এগিয়ে আসেন। কিন্তু পাশাপাশি সেই গ্রামেরই একজন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকের পরিবারের কথা ধরুন। সরকারের নির্ধারিত অল্প আয়ে তার সংসার চলে।

তিনি কারো কাছে হাত পাততে পারেন না। চালের লাইনে দাঁড়াতে পারেন না। বিপদে পড়লেও কারো সাহায্য চাইতে হাত ওঠে না। চুলায় হাঁড়ি না চড়লেও তাকে সামাজিক মর্যাদা বজায় রাখতে ঠাট দেখিয়ে চলতে হয়। মুখ বুজে সয়ে যান দারিদ্র্যের কষাঘাত। সেই ভিক্ষুকের সংসার কিন্তু তার প্রতিবেশী শিক্ষকের চেয়ে বেশি সচ্ছল। কিন্তু ভিক্ষুক রাস্তায় বেরুলে সবাই তাকে করুণার চোখে দেখে আর শিক্ষক রাস্তায় বেরুলে লোকে তাকে সালাম দেয়। এবার আপনিই বলুন আপনি ভিক্ষুক হতে চাইবেন না শিক্ষক?

সেটা আপনার পছন্দ, আপনার বিবেচনা। আমি কিন্তু শিক্ষকই হতে চাইবো। মানুষের জীবনে সবকিছু অর্থ দিয়ে মাপা যায় না। গেলে সবাই ব্যবসায়ীই হতে চাইতো। এখন প্রশ্ন হলো, সেই শিক্ষক কি সারা জীবন দরিদ্রই থেকে যাবেন? সেই শিক্ষক যদি সৎ হন, দক্ষ হন, চালাক হন; তাহলে তারও সুযোগ আছে নিজের ভাগ্যকে বদলে নেওয়ার। নিজের বাড়ির পাশে শাকসবজি চাষ করে, গরু-ছাগল-মুরগি পুষে, পুকুরে মাছ চাষ করে ধীরে ধীরে নিজের পরিবারে সচ্ছলতা আনার সুযোগ কিন্তু তার সামনেও আছে।

বাংলাদেশের অবস্থা এখন ঠিক এই পর্যায়ে। কিছু কিছু মর্যাদা আছে, অর্জন করার চেয়ে ধরে রাখা কঠিন। বাংলাদেশের সামনেও কঠিন চ্যালেঞ্জ। মর্যাদার এই অর্জন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় চাপ সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশ কি সেই চাপ সামলাতে পারবে? আমার ধারণা পারবে। প্রথম কথা হলো, বাংলাদেশ আরো কমপক্ষে ৯ বছর সময় পাবে প্রাথমিক ধাক্কা সামলানোর জন্য। উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হলেও ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বল্প সুদে ঋণ এবং রফতানি সুবিধা পাবে।

কিছু কিছু সুবিধা বহাল থাকবে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত। বাংলাদেশকে এখন সেই শিক্ষকের মতো নিজের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। উন্নয়নশীল দেশ হলে ঋণ নিতে হবে চড়া সুদে এটা যেমন ঠিক, তেমনি সম্ভাবনা আছে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার। তবে ভাবার কারণ নেই, উন্নয়নশীল দেশ হলেই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঝাঁপিয়ে পড়বে। বিদেশি বিনিয়োগ আনতে হলে অবকাঠামো, সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে; আমলাতন্ত্রকে গতিশীল করতে হবে।

কিন্তু বাংলাদেশের এখনকার পরিস্থিতি কি বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক? নিজের পয়সায় গড়ে উঠতে থাকা পদ্মা সেতু আমাদের সক্ষমতার বড় সাইনবোর্ড। কিন্তু বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনও উন্নয়নশীল দেশের সমান্তরাল নয়। জ্বালানি খাতও বিনিয়োগের পথে বড় বাধা। আরেকটি বড় বাধা দুর্নীতি। বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে এসব দিকে নজর দিতে হবে। উন্নয়নশীল দেশ হলে রফতানির ওপর যে চাপ আসবে, তা সামলাতে নতুন বাজার খুঁজতে হবে, নতুন ও মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন করতে হবে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বাড়াতে হবে। আয়কর ও ভ্যাট আদায়ে আরও দক্ষ হতে হবে।

এই যে হবে হবে বলছি; বলা যত সহজ, করা ততই কঠিন। এটা পল্টন ময়দানের বক্তৃতা বা মধ্যরাতের টকশো নয়। তবে কঠিন হলেও কাজটা অসম্ভব নয়। সাঁতার শিক্ষতে হলে যেমন পানিতে নামতে, হাঁটতে শিখতে হলে যেমন আছাড় খেতে হয়; তেমনি উন্নয়নশীলের কঠিন রাস্তায় উঠে গেলেই আমাদের সক্ষমতা বাড়বে, দৌড়াতে শিখবো। গত কয়েক বছরে আমরা যে গতিতে, যে ধারায় উন্নতি করছি, তা-ই আমাকে আশাবাদী করেছে।

তবে দৌড়ের প্রথম দিকটা যতটা সহজ, পরের দিকটা ততটাই কঠিন। সবসময় একই গতিতে দৌড়ানো সম্ভব নয়। এখন আমরা উন্নয়নের দৌড়ের কঠিন পর্যায়ে আছি। এ জন্য চাই দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার। নিজেদের সক্ষমতা যেমন বাড়াতে হবে, তেমন নিশ্চিত করতে হবে সুশাসন, বিশেষ করে ব্যাংক এবং আর্থিক খাতে সুশাসন। নিশ্চিত করতে হবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা। অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাত ধরে বদলে যাবে মানুষের জীবনমান। তবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে যদি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকে, যদি মানবাধিকার পরিস্থিতি ভালো থাকে, যদি গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকে; তাহলে সেই অর্জনটা অনেক বেশি আনন্দময় ও স্বস্তির হবে।

৪৭ বছর বয়সী বাংলাদেশের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ যেমন আছে, আছে অফুরান সম্ভাবনাও। একজন বাংলাদেশি হিসেবে, একটি উন্নয়নশীল দেশের নাগরিক হিসেবে আমি গর্বিত। যে যাই বলুক, এ অর্জন বিশ্বে আমাদের মাথা উঁচু করেছে। এ অর্জন সম্মানের, এ অর্জন উদযাপনের। হিপ হিপ হুররে, থ্রি চিয়ার্স ফর বাংলাদেশ।

এসএইচ-২৭/২২/০৩ (প্রভাষ আমিন, লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ। বাংলা ট্রিবিউন। লেখকের নিজস্ব মতামত। এই মতামতের সাথে আমাদের কোন সম্পৃক্ততা নেই)