মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে চলছে পুলিশের ‘তালিকাবাণিজ্য’!

প্রকাশিতঃ জুন ১১, ২০১৮ আপডেটঃ ৫:৪৭ অপরাহ্ন

পুলিশ সারাদেশে মাদকবিরোধী অভিযানকে কেন্দ্র করে ‘তালিকাবাণিজ্যে’ নেমেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চাহিদা মতো অর্থ না দিলে আটক ব্যক্তিদের নাম মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকায় ঢুকিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে পুলিশ। এছাড়া, পুলিশের সোর্স কিংবা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে যারা পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের কাছে তথ্য দিতেন, এমন অনেককে আটকের পর মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে গ্রেফতার দেখানো হচ্ছে। আবার প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে।

ঢাকার রামপুরার বাগিচারটেক এলাকার বাসিন্দা শাহীন আহমেদ (৪০)। এলাকার বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে নষ্ট হয়ে যাওয়া এয়ারকন্ডিশনার (এসি) মেরামতের কাজ করেন তিনি। সেই সুবাদে অনেকের সঙ্গেই পরিচয় রয়েছে তার। এলাকায় নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন শাহীন। মাদক ব্যবসায়ী ও এর সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধেও তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করতেন। কয়েক মাস আগে রামপুরা থানার সিদ্দিক নামে একজন সাব-ইন্সপেক্টরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে।

বুধবার দিবাগত রাতে শাহীনকে একটি মোটরসাইকেলসহ আটক করে পুলিশ। পরে দেখানো হয়, তার কাছে ১৩৫ পিস ইয়াবা পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় রামপুরা থানায় পুলিশের দায়ের করা মামলায় শাহিনকে গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত দু’পক্ষের বক্তব্য শুনে রিমান্ডের আবেদন না মঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

আরও খবর: ‘খালেদা রাজি থাকলে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হবে মঙ্গলবার’

শাহীন আহমেদের ছোট বোন জান্নাতুল ফেরদৌস লিনা বলেন, পুলিশ সদস্যদের অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযোগ করায় তার ভাইকে মাদক ব্যবসায়ী বানানো হয়েছে। তিনি এলাকায় বাসাবাড়িতে এসি মেরামতের কাজ করতেন। এলাকায় কোনও অন্যায়-অনিয়ম দেখলে তিনি প্রতিবাদ করতেন। সংশ্লিষ্ট দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সেটা জানিয়ে দিতেন। সেই সুবাদে তার সঙ্গে অনেকের পরিচয় ছিল। বুধবার দিবাগত রাত একটার দিকে একটি ফোন পেয়ে তিনি ঘর থেকে বের হন।

এরপর শুনি তাকে ইয়াবাসহ পুলিশ আটক করেছে। থানায় নিয়ে তাকে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে। অতীতে তার বিরুদ্ধে থানায় কোনও মামলা বা অভিযোগ ছিল না। মাদক ও পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার কারণেই তার ভাইকে মাদক ব্যবসায়ী বানানো হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

শাহীনের বোনের এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রামপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রলয় কুমার সাহা বলেন, ভাই এমন প্রশ্ন করলে কষ্ট পাই। সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগ। যে অভিযোগ করেছে তাকে নিয়ে আইসেন। বাগিচারটেকের শাহীনকে ১৪-১৫ জন লোকের সামনে থেকে আমরা ১৩৫ পিস ইয়াবাসহ ধরেছি। বহুদিন বেটাকে ধরতে পারিনি। এবার পেরেছি। সে অরিজিনালি ইয়াবা ব্যবসায়ী।

রাজধানীর দোয়েল চত্বর ও হাইকোর্ট মাজারের মাঝামাঝি স্থানে পুলিশের তল্লাশিতে পড়েন নিউমার্কেটের এক ব্যবসায়ী। হয়রানির ভয়ে পত্রিকায় নিউজ হোক এটাও চান না তিনি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই ব্যবসায়ী বলেন, গত ২৮ মে ভোরে আমি নিউমার্কেট থেকে কাপ্তানবাজারে যাচ্ছিলাম। হাইকোর্ট মাজারের একটু আগে আমার মোটরসাইকেল থামিয়ে তল্লাশি করে তারা। একপর্যায়ে পুলিশ বলে, এই ইয়াবা ব্যবসায়ীকে গাড়িতে ওঠা। তখন আমি বলি, স্যার, আমি নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী, বিশ্বাস না হইলে আমারে নিয়ে নিউমার্কেটে চলেন।

আমার এই কথা শুনে পুলিশ বলে, আমরা কি তোর বাপ-দাদার চাকর? ওদের বিশ্বাস করার জন্য আমার পরিচিত একজনকে ফোন করে জানালাম। সে আসার পর পুলিশ তাকেও ধরে। তার উদ্দেশে পুলিশ সদস্যরা বলেন, এই, এটা ইয়াবার ডিলার, এরেও গাড়িতে ওঠা। এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর আমার কাছে ছিল ২০ হাজার টাকা, আর আমার পরিচিতজনের কাছে ছিল ৬ হাজার টাকা। মোট ২৬ হাজার টাকা দেওয়ার পর আমরা ছাড়া পাই। তবে কোন থানার পুলিশ সদস্যরা তখন সেখানে দায়িত্বে, তা জানাতে পারেননি ওই ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, আমি তাদের এ কথা জিজ্ঞেস করার সাহস পাইনি। আগে ফাঁকা রাস্তায় ছিনতাইকারীর ভয় পাইতাম। এখন ফাঁকা রাস্তায় পুলিশ দেখলে ভয় পাই।

পুলিশ সদস্যদের মাদক ব্যবসা, নিরীহদের ধরে মাদক ব্যবসায়ী বানিয়ে ‘তালিকাবাণিজ্যের’ অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের জনসংযোগ বিভাগের এআইজি সহেলী ফেরদৌস বলেন, এমন অভিযোগ আমরা পাচ্ছি লিখিত কিংবা মেইলে। সব অভিযোগেরই তদন্ত করা হবে। তদন্ত শেষে অভিযোগের প্রমাণ পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় এবং ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব ক্ষেত্রে কোনও ছাড় দেওয়া হবে না।

এমও-১১/১১-০৬ (ন্যাশনাল ডেস্ক, তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন)